আমার কথা ও লিখার স্বাধীনতা থাকতেই হবে: ফুলতলীর মতো মৌলবাদী সংগঠন আমার স্বাধীনতায় বাধা দেওয়ার অধিকার পায় কোথায়?
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধুই একটি সাংবিধানিক অধিকার নয়—এটি মানুষের অস্তিত্বের মৌলিক শর্ত। মানুষ ভাবতে পারে, বলতে পারে, লিখতে পারে—এ ক্ষমতা তাকে মানুষ হিসেবে আলাদা করে। কিন্তু যখন সমাজে কিছু মৌলবাদী গোষ্ঠী নিজেদের বিশ্বাসকে রাষ্ট্রের আইন, সামাজিক নীতি এবং অন্যের স্বাধীনতার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন সেই স্বাধীনতা বিপদের মুখে পড়ে। আজ যে প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে—ফুলতলীর মতো মৌলবাদী সংগঠন আমার লিখার স্বাধীনতায় বাধা দেওয়ার অধিকার পেল কোথা থেকে?
সত্য হলো, কোনও সংগঠন, যাই হোক না কেন তার আকৃতি, জনপ্রিয়তা বা দাবি—কোনও অবস্থাতেই ব্যক্তির মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার অধিকার রাখে না। রাষ্ট্রও না। সমাজও না। মতাদর্শও না। কিন্তু মৌলবাদী সংগঠনগুলোর প্রবণতা ঠিক উল্টো—তারা ভিন্নমতকে ভয় পায়, প্রশ্নকে ভয় পায়, যুক্তিকে ভয় পায়। কারণ যুক্তির সামনে অন্ধ অনুসরণ টিকতে পারে না, সমালোচনার সামনে ভয়ভীতি দেখানোর রাজনীতি দাঁড়াতে পারে না।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে শুধু আমার কথা বলার অধিকার নয়
এটি মানে—
- আমি যে বিষয়ে লিখব, তা ঠিক করার অধিকার আমারই
- আমার ভাষা, আমার যুক্তি, আমার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কারও ‘আনুকুল্য’ প্রার্থনা করতে হবে না
- কেউ না-পছন্দ করলেই লেখা বন্ধ হবে না
- এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কোনও সংগঠন আমার মুখ বন্ধ করতে পারে না
মৌলবাদী সংগঠনগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানে: তারা রাষ্ট্র, সমাজ এবং সত্যের চেয়ে নিজেদের মতাদর্শকে বড় মনে করে। তাই তারা মনে করে, কেউ ভিন্নভাবে লিখলে বা প্রশ্ন করলে তাদের ‘সামাজিক অনুমতি’ নিয়ে নিতে হবে। অথচ গণতান্ত্রিক সমাজে এমন অনুমতির ধারণাই অবৈধ।
ফুলতলীর মতো গোষ্ঠীর চিরাচরিত কৌশল: ভয় দেখানো, অভিযুক্ত করা, চুপ করানো
এ ধরনের গোষ্ঠী সাধারণত তিনটি পদ্ধতিতে ভিন্নমত দমন করতে চায়—
- ভয় দেখানো—“এভাবে লিখলে সমাজ নষ্ট হবে”, “তুমি ধর্মবিরোধী”, “তোমাকে থামাতে হবে”—ইত্যাদি কথায় ভীতির পরিবেশ তৈরি করে।
- ব্যক্তিগত চরিত্রহরণ—সমালোচনাকে ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিণত করে।
- সমষ্টিগত চাপ—একটি ভিড়ের মানসিকতা তৈরি করে লেখকের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমি যা লিখব তা কি সত্যিই ফুলতলী বা অন্য কোনও গোষ্ঠীর সার্টিফিকেটের ওপর নির্ভর করবে?
না।
একেবারেই না।
কারণ লেখালেখি কোনও অপরাধ নয়।
আর মতপ্রকাশ কোনও বিদ্রোহ নয়।
এটি নাগরিকত্বের মৌলিক প্রকাশ।
ভিন্নমতকে বন্ধ করা মানে সমাজকে অন্ধ করা
একটি সুস্থ সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—ভিন্নমত, অপ্রিয় মত, এমনকি বিতর্কিত মতও টিকে থাকতে পারে। যত মত থাকবে, ততই যুক্তির ক্ষেত্র বিস্তৃত হবে। আর যতই সমালোচনার সুযোগ থাকবে, ততই সমাজ এগোবে।
কিন্তু মৌলবাদী সংগঠনগুলো ঠিক উল্টোটা চায়—একটি মাত্র মত, একটি মাত্র ব্যাখ্যা, একটি মাত্র কণ্ঠস্বর।
এই একরৈখিকতা সমাজকে এগিয়ে নেয় না—বরং পশ্চাৎমুখী করে।
তাদের জন্য ভিন্নমত মানে ‘শত্রু’, প্রশ্ন মানে ‘অপমান’, সমালোচনা মানে ‘অপরাধ’।
এটাই মৌলবাদ।
এভাবেই স্বাধীনতা হরণ শুরু হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো: তারা এই অধিকার পেল কোথায়?
সংবিধান কি তাদের দিয়েছে?
না।
রাষ্ট্র কি দিয়েছে?
না।
সমাজ কি দিয়েছে?
সমাজও না।
তাহলে?
তারা নিজেরাই নিজেদের এ অধিকার ‘দাবি করে বসেছে’, যেমন প্রতিটি মৌলবাদী গোষ্ঠী ইতিহাসে করেছে।
এটাই তাদের অভ্যাস—ভয় দেখিয়ে ক্ষমতা নেওয়া, হুমকি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, আর চাপে ফেলে মত দমন করা।
আমার লিখা আমার—কোনো ফুলতলী বা মৌলবাদী গোষ্ঠীর নোটিশের প্রয়োজন নেই
লেখক হিসেবে আমি যা দেখি, ভাবি, বুঝি—তা লেখার অধিকার আমার।
এ অধিকার কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা নেই কোনও সংগঠনের।
যদি কেউ মনে করে আমার লেখা ভুল—তাহলে তারও মতামত লেখার অধিকার আছে।
কিন্তু লেখা বন্ধ করানোর অধিকার?
না—গণতন্ত্রে এমন অধিকার কারও নেই।
মৌলবাদী গোষ্ঠীর ভয় থাকেই—কারণ লেখা মানুষের মন পাল্টায়
লেখা প্রশ্ন তোলে।
প্রশ্ন ভয়ের কারণ।
কারণ প্রশ্ন করলে মানুষ আর অন্ধ থাকে না।
সচেতন হয়।
আর এটাই মৌলবাদীরা সহ্য করতে পারে না।
তাই তারা লেখাকে ভয় পায়।
লেখককে ভয় পায়।
শব্দকে ভয় পায়।
কিন্তু ভয় দেখিয়ে লেখা থামানো যায় না—ইতিহাস প্রমাণ করে, প্রতিবারই লেখাই জিতেছে।
শেষ কথা
আমার কথা ও লিখার স্বাধীনতা কোনও দয়া নয়—এটি আমার অধিকার।
ফুলতলীর মতো মৌলবাদী সংগঠন যদি মনে করে ভিন্নমত দমন করবে—তাহলে তাদের জানা দরকার:
সমালোচনা থামানো যায়, কিন্তু চিন্তা থামানো যায় না।
শব্দকে আটকে রাখা যায়, কিন্তু সত্যকে নয়।
আমি লিখব—কারণ এটি আমার দায়িত্বও।
আমি লিখব—কারণ নীরবতা মৌলবাদের সবচেয়ে বড় খাদ্য।
আমি লিখব—কারণ স্বাধীনতা রক্ষা করা ছাড়া স্বাধীনতা টিকে থাকে না।