ফুলতলীর ফতোয়া বাজী কি শেষ হবে না? সামনে নির্বাচনে মানুষ কেন তাদের ভোট দেবে?
বাংলাদেশে যখনই নির্বাচন ঘনিয়ে আসে, তখনই ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে ফুলতলী ধারার কিছু আলেমের ফতোয়া–বাজী আবারও আলোচনায় এসেছে। তারা যেনো জনগণের জীবন-যাপন থেকে রাষ্ট্রব্যবস্থা পর্যন্ত সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একধরনের ‘ধর্মীয় লাইসেন্স’ নিজেদের হাতে তুলে নিতে চান। প্রশ্ন হলো—এই ফতোয়া–বাজী কি কখনোই বন্ধ হবে না?
ধর্মের নামে বিভ্রান্তি ছড়ানো আমাদের সমাজে নতুন নয়। কিন্তু এখন যে ধারা দেখা যাচ্ছে, তা আরও বেশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, আরও বেশি সংগঠিত। একটি বিশেষ গোষ্ঠী ভোটের রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করছে। তারা সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করাতে চায় যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও নাকি ‘ফতোয়া’ দিয়ে ঠিক করতে হবে। অথচ ইসলামের মূল শিক্ষায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, সামাজিক–রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে যুক্তিবোধ, ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণই গুরুত্বপূর্ণ।
ফুলতলী ধারার জনপ্রিয়তা একসময় ছিল মূলত ধর্মীয় সংস্কৃতি ও মরমী চেতনার কারণে। কিন্তু এখন তার কিছু অনুসারী রাজনৈতিক ফায়দা লোটার সুবিধাজনক মুহূর্ত দেখলেই ফতোয়া জারি করে বসে। কখনও নারীশিক্ষা নিয়ে, কখনও সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়ে, আবার কখনও সাধারণ নাগরিক অধিকার নিয়ে। এতে যেমন জনগণের ভেতরে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তেমনি দেশের অগ্রগতিও ব্যহত হয়।
সামনে জাতীয় নির্বাচন। ভোটের অধিকার সবার, কিন্তু ভোটের ব্যবহার ব্যক্তির চিন্তা–বিবেচনা, যুক্তি ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতার ওপর নির্ভর করা উচিত। প্রশ্ন হলো—মানুষ কেন এমন একটি গোষ্ঠীকে সমর্থন করবে, যাদের কাজই হলো সমাজকে পিছিয়ে দেওয়া, আধুনিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধকে বাধাগ্রস্ত করা? যারা নির্বাচনকালীন সময়ে বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে ভোটকে প্রভাবিত করতে চায় ধর্মীয় ভীতি তৈরি করে—তাদের আসল উদ্দেশ্য কি জনগণের কল্যাণ, নাকি নিজেদের প্রভাব বিস্তার?
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ধর্মপ্রাণ, কিন্তু তারা বোকা নয়। তারা জানে ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে খেলা করা এবং সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া কারও কল্যাণ বয়ে আনে না। বরং এই ধরনের ফতোয়া–বাজী দেশকে বারবার সংকটে ফেলে। ভোটের মাঠে স্রেফ ফতোয়া বা ভয় দেখিয়ে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এমন ধারণা এখন অনেকটাই পুরনো। মানুষ এখন প্রশ্ন করে, যুক্তি খোঁজে, তথ্য দেখে।
ফুলতলী ধারার কিছু অংশ যে সমস্যা সৃষ্টি করছে, তা পুরো সম্প্রদায়কে দোষী করে না। কিন্তু ধর্মকে রাজনৈতিক দণ্ড বানানোর প্রবণতা যদি থামাতে হয়, তবে সমাজকেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ভোটের সময় মানুষের উচিত নিজেদের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, শিক্ষাব্যবস্থা, নারীর অধিকার এবং সামগ্রিক অগ্রগতির কথা বিবেচনা করা।
ফতোয়ার নামে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ যতদিন থাকবে, ততদিন প্রশ্ন জাগবে—এই ফতোয়া-বাজী কি কখনোই বন্ধ হবে না? কিন্তু সত্য হলো: সিদ্ধান্ত জনগণের। তারা চাইলে এই প্রবণতা থামবে। আর তাই নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সময় সচেতনতা, যুক্তিবোধ এবং অগ্রগতির প্রতি প্রতিশ্রুতিই হওয়া উচিত জনগণের প্রধান হাতিয়ার।