দাড়ি টুপি পরা অসংখ্য মুসল্লী পাবেন যারা রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি সমস্ত কিছু নিয়ে অনেক গভীর পর্যন্ত ভাবছেন, ভাবতে পারছেন।

May 21, 2025

এই প্রগতিশীল চিন্তা কি? প্রগতিশীল মানে প্র-গতি, গতির সামনের দিকে, মানে যেই চিন্তা মানুষের সভ্যতা এবং সংস্কৃতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে সেইটাই প্রগতিশীল চিন্তা। এখন এই চিন্তা পদ্ধতি যদি আপনাকে সামনের দিকে পথ না দেখায় তাহলে এইটা প্রগতিশীল চিন্তা না। আপাত অর্থে আমাদের মনে হয় এই ব্যক্তি সংস্কৃতিচর্চার সাথে যুক্ত আছেন মানে উনার চিন্তা তুলনামূলক আগানো হবে, মৌলবাদী বা কট্টর হবে না। আবার ধর্মচর্চা করে বলে আমরা ধরেই নেই যে, এর চিন্তা মৌলবাদী বা কূপমন্ডুক হতে বাধ্য। কিন্তু বাস্তব জীবনে আপনি কথা বলতে যেয়ে এইরকম অসংখ্য শিল্প সাহিত্যিক পাবেন যাদের রাষ্ট্র, রাজনীতি, মানুষ, সমাজ-সংস্কৃতি সমস্ত কিছু নিয়ে অত পরিষ্কার ধারনা নেই বা তারা খুব বেশি হয়ত ভাবছেনও না। আবার দাড়ি টুপি পরা অসংখ্য মুসল্লী পাবেন যারা রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি সমস্ত কিছু নিয়ে অনেক গভীর পর্যন্ত ভাবছেন, ভাবতে পারছেন।

এখন আসি বাংলাদেশের রাজনীতি এই ধর্ম বনাম প্রগতিশীলতা এই বাইনারি কেনো আসলো? কিভাবেই বা এই বাইনারি কাজ করছে? এবং এই বাইনারি বিদ্যমান থাকলে সমস্যাই বা কি?

সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যখন হাতে নেয়া হয় তখন প্রবলেম ট্রি এনালাইসিস (Problem tree analysis) বা সমস্যাবৃক্ষ বিশ্লেষণ বলে একটা ম্যাথোড ফলো করা হয়। মানে বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থায় প্রধান সমস্যা কি? এইটা ধরে সেই সমস্যার মূল কারন খোঁজা হয়। বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থায় আপনি প্রধান সমস্যা যা চিহ্নিত করবেন সেই সমস্যা সমাধানেইতো প্রেসক্রিপ দেবেন তাই না? রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও তাই সমস্যা চিহ্নিতকরন মেথড একইভাবে কাজ করে। মানে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় একটি রাজনৈতিক দল প্রধান সমস্যা হিসেবে যা চিহ্নিত করে সেই সমস্যা সমাধানেই তাদের দল কাজ করে এবং সেই মতই তাদের রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করে। সমস্যা বৃক্ষের নীচের দিকে থাকে কারন আর উপরের দিকে থাকে সেই সমস্যার ফলাফল। এখন কোনো রাজনৈতিক দল যদি ধরে নেয় বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা ‘ধর্মীয় মৌলবাদ’ তাহলে সে সেই কারনগুলো চিহ্নিত করবে এবং র্ধমীয় মৌলবাদ নিরসনের জন্য কাজ করবে এবং তাদের রাজনৈতিক বয়ান সম্পূর্ণ এই আঙ্গিকে তৈরি করবে। আর কোনো রাজনৈতিক দল যদি প্রধান সমস্যা চিহ্নিত করে ‘বৈষম্য’ তাহলে সে বৈষম্য এর পিছনের কারনগুলো চিহ্নিত করবে এবং তার রাজনৈতিক বয়ানগুলো সেই ভাবেই তৈরি করবে। আমি উদাহরন দিয়ে বিষয়টা একটু বোঝানোর চেষ্টা করি।

ধর্মীয় মৌলবাদের পিছনে আরো কারন থাকেত পারে। আমি কেবল প্রধান চারটি কারনকে উদাহরণ হিসেবে নিলাম। দেখুন, আপনি যখন রাজনৈতিকভাবে মনে করছেন ধর্মীয় মৌলবাদ হচ্ছে প্রধান সমস্যা তখন আপনি এই সমস্যা থেকে পরিত্রান চাইবেন। এই সমস্যা থেকে পরিত্রানের উপায় হিসেবে এই ধর্মীয় মৌলবাদ বিস্তারের পিছনে যে কারনগুলো আছে আপনি সে কারণগুলোকে চিহ্নত করবেন, সে কারনগুলোকে মোকাবিলা করার জন্যই রাজনৈতিক প্রস্তাবনা পেশ করবেন এবং আপনার সমস্ত রণকৌশল আপনি সাজাবেন সেই মোতাবেকই। কারন আপনি তো আপনার প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ধর্মীয় মৌলবাদকে।

এবার আসেন আমি প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নত করলাম বিদ্যমান বৈষম্যকে। তাহলে আমার প্রবলেম-ট্রির চেহারা কেমন দাঁড়াচ্ছে একটু দেখি।

সমস্যা হিসেবে বৈষম্যের ব্যপ্তি এবং শেকড় এত গভীরে যে এর কারন সুনির্দিষ্ট করতে থাকলে আসলে আরো কয়েক স্তর নীচে যাবে। এখন মোদ্দা কথায় আসি। মানে আমি যখন বিদ্যমান সমস্যা হিসেবে বৈষম্যকে চিহ্নিত করলাম তখন আমি তার কারনগুলো র্নিমূল করার চেষ্টা করব। আমার রাজনৈতিক বয়ান তখন সব ধরনের বৈষম্যের পিছনে কারনগুলোকে চিহ্নিত করে তাকে মোকাবিলা করার চেষ্টা করবে। আমার রাজনৈতিক বযানও ওইভাবে সাজানো হবে।

এখানে একটু যোগ করে নেই যে, রাজনৈতিক বয়ান বলতে আমি বুঝি একটা দেশের বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের উপায় কি হওয়া উচিত সেইটার একটি রাজনৈতিক প্রস্তবনা।  

এখন খুব সরল একটা প্রশ্ন করি। আপনি যখন ধর্মীয় মৌলবাদকে বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করছেন এবং তখন সেই সমস্যা নির্মূল করার জন্য যে রাজনৈতিক বয়ান হাজির করছেন সেই রাজনৈতিক বয়ান বিদ্যমান সকল ধরনের বৈষম্য র্নিমূল করতে পারবে কি? তাহলে যে রাজনৈতিক দল বৈষম্য র্নিমূল করতে চায় তারা প্রধান সমস্যা হিসেবে ধর্মীয় মৌলবাদ চিহ্নিত করতে পারে কি না?

যে রাজনৈতিক দলগুলো প্রধান সমস্যা হিসেবে ধর্মীয় মৌলবাদকে চিহ্নিত করছে তারাই এই সমস্যাকে মোকাবিলা করার জন্য কাউন্টার-থট হিসেবে প্রগতিশীল চিন্তাকে হাজির করছে। এখন এই বাইনারিতে থাকলে সমস্যা কি? সমস্যা অন্য কিছুই না। সমস্যাটা ওপরে দেখিয়েছি। ধর্মীয় মৌলবাদ প্রধান সমস্যা হলে আপনি মৌলবাদকে ফাইট দিতে পারবেন, কিন্তু তাতে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য কিংবা লৈঙ্গিক বৈষম্য র্নিমূলের কোনো কাজ হবে না, কোনো পথ বাতলানো হবে না। এই জন্য যে কোনো রাজনৈতিক বয়ান তৈরির আগে প্রধান সমস্যা কোনটা তা চিহ্নত করা সবচেয়ে জরুরী। কারন সমস্যা যা চিহ্নিত করবেন আপনি সমাধানও ঠিক সেই মোতাবেকই প্রস্তাব করবেন, তাই না?