ভারতবর্ষের বহু বড় বড় মন্দিরের ইট-পাথরের জাঁকজমক, স্থাপত্যের ঠাটবাটের তলায় চাপা পড়ে আছে এদেশের হাজার হাজার ইতিহাস-বর্জিত নারীর নীরব অশ্রু-রক্ত-কান্না

February 20, 2024

আমাদের দেশে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ইতিহাসে শিক্ষায়। সঙ্ঘ পরিবারের সরাসরি হস্তক্ষেপের বহুকাল আগে থেকে সিলেবাস এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে ইংরেজদের শেখানো কথা মুখস্থ করেই আমরা স্বাধীন ভারতেও ইতিহাস বইতে একপেশেভাবে পড়ে আসি: মুসলিম রাজত্বে ধারাবাহিকভাবে হিন্দুদের উপরে ধর্মীয় নির্যাতন করা হয়েছে, হাজার হাজার মন্দির ভেঙে দেওয়া হয়েছে, হিন্দুদের জোর করে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। ফলে অধিকাংশ ভারতীয় যখন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হয়ে ওঠে, এই ধারণাগুলি তার মনে প্রায় স্বতঃসিদ্ধের মতো কাজ করতে থাকে। তার পরেও যদি সে মুসলমানদের প্রতি সহিষ্ণুতা দেখায় সে তার নিতান্তই উদারতা। কিন্তু যে তথ্যগুলি তাকে কখনও শেখানোই হয় না আমি এখানে তার কিছু কিছু তুলে ধরতে চাই:

১) মুসলমান রাজত্বের অনেক আগে থেকেই ভারতে দেবস্থান ভাঙা এবং দখল করার কাজ হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদীরা নিজেরাও করে এসেছে। হাজার হাজার বৌদ্ধমঠ এক সময় হিন্দুরা দখল করে মন্দির বানিয়ে ফেলেছে। [বিবেকানন্দ ১৯৮৬, ৯/২৮] এমনকি, পুরীর বিখ্যাত জগন্নাথ মন্দিরও এক সময় একটা বৌদ্ধমঠ ছিল। [বিবেকানন্দ ১৯৮৬; ৬/১২৯, ৯/৭২] স্বামী বিবেকানন্দের রচনা থেকেই আমি প্রথম এই তথ্যটি পাই। এবং হিন্দু রাজারা শুধু যে বৌদ্ধমঠ ভেঙেছেন বা দখল নিয়েছেন তাই নয়, তারা অনেকেই হিন্দু মন্দিরও ভেঙেছেন, হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি চুরি বা লুট করে এনে বিলাসিতার পাথেয় সংগ্রহ করেছেন। [Sharma 1990] সঙ্ঘপরিবার রামমন্দির বা মধ্য যুগের ইতিহাস নিয়ে বেশি খোঁচাখুঁচি না করলে আজও হয়ত এই সব তথ্য আমাদের অজানাই থেকে যেত। আমি বরং বিজেপি কোম্পানিকে ধন্যবাদ দিই, আমাদের দেশের অন্ধকারে পড়ে থাকা এই সব তথ্য আমাদের জানতে সাহায্য ও প্ররোচিত করার জন্য।

২) এই প্রশ্নটা নিয়ে কতজন ভেবেছেন, যে দেশে বুদ্ধদেবের জন্ম, বৌদ্ধধর্মের উৎপত্তি, প্রায় সারা এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়া সেই ধর্ম কেন সেই ভারতের বুকেই প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রশ্নটা অন্তত উত্থাপন করেছিলেন। কিন্তু না তিনি, না অন্য কেউ এই নিয়ে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান চালিয়েছেন। কেন করেননি তার আমি কেবলমাত্র আন্দাজ করতে পারি: সন্ধানের ফলটা হয়ত অনেকের কাছেই ঠিক সুস্বাদু লাগবে না। দীনেশ চন্দ্র সেন বলেছেন, বৌদ্ধদের উপর নির্যাতন করার জন্য শঙ্করাচার্য নাকি সঙ্গে নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে ঘুরতেন। [সেন ১৯৩৫, ১/৯; বিবেকানন্দ ১৯৮৬, ৯/৭২] গয়ায় “বোধিদ্রুম” নামক যে বোধিবৃক্ষের নিচে বসে গৌতম “বুদ্ধ” হয়েছিলেন বলে বৌদ্ধদের বিশ্বাস, গৌড়ের রাজা শশাঙ্কর আমলে তার গোড়া শুদ্ধ কেটে ফেলা হয় (এখন সেখানে যে গাছটি দেখা যায়, সেটা অনেক পরে শ্রীলঙ্কা থেকে চারাগাছ এনে বসানো হয়েছে)। [অপূর্বানন্দ ১৯৭৮, ৭২-৭৩] বৌদ্ধ পুঁথিগুলি এই দেশ থেকে সম্পূর্ণ লোপাট করে দেওয়া হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘পূজারিণী’ কবিতায় লিখেছেন,

“অজাতশত্রু রাজা হল যবে পিতার আসনে আসি’,
পিতার ধর্ম শোণিতের স্রোতে,
মুছিয়া ফেলিল রাজপুরী হতে,
সঁপিল যজ্ঞ-অনল-আলোতে বৌদ্ধ-শাস্ত্র-রাশি।”

গুপ্ত যুগে ইলোরা-অজন্তার মতো দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে পাথর কেটে কেন বৌদ্ধদের সঙ্ঘারাম বা আশ্রয় বানাতে হয়েছিল, এরও উত্তর একজন আধুনিক ইতিহাসবিদকে খুঁজে দেখতে হবে। এবং মনে রাখতে হবে, বৌদ্ধদের ভারত ছাড়া করার কাজটাও বিজেপি-র লোকেরা এসে করেনি। মুসলিমদেরও ভারতে আগমনের অন্তত পাঁচশ বছর আগে এই কুকম্মটি প্রায় সুসম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল।

৩) এটা ঠিক যে মুসলিম আমলে বেশ কিছু হিন্দু মন্দির ভাঙা হয়েছে। সেই ভাঙা মন্দিরের অনেকগুলিরই অবশেষও আজও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে গেলে দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু অদ্ভুত ঘটনা হল—অধিকাংশ ইতিহাসবিদ চেপে গেছেন এই সত্যটা যে অসংখ্য মন্দির গড়ে দিয়েছে বা গড়তে সাহায্য করেছে মুসলিম শাসকরা—টাকাপয়সা জমি দান করে, করমুক্তি দিয়ে ও অন্যান্য ভাবে। অযোধ্যা সহ ভারতের যেখানে যত পুরনো মন্দির এখনও টিকে আছে, তার সবই ত্রয়োদশ শতাব্দ বা তারপরে নির্মিত হয়েছে। এমনকি যে অওরঙজেবকে আমাদের পাঠ্যপুস্তকে তীব্র হিন্দুবিদ্বেষী বলে চিত্রিত করা হয়ে থাকে, গোটা উত্তর এবং পূর্ব ভারতে তাঁরই দানে ও সহায়তায় অনেকগুলি মন্দির গড়ে উঠেছিল। [Pandey 1984, 41-56] অধ্যাপক যদুনাথ সরকার থেকে শুরু করে অধিকাংশ ইতিহাস লেখক তাঁর মন্দির ভাঙার কথাই শুধু প্রচার করে গেছেন, মন্দির গড়ে তোলার একটা ঘটনারও স্বীকৃতি দেননি। এই তথ্যও কোথাও পড়ানো হয় না যে টিপু সুলতান তাঁর অতি ক্ষুদ্র রাজ্যে অন্তত ১৫৬টি মন্দির হিন্দুদের জন্য তৈরি করে দিয়েছিলেন। [Ibid, 38]

৪) মন্দির ভাঙা, দেবমূর্তি চুরি ইত্যাদি ঘটনাগুলির ক্ষেত্রে কোনটা ধর্মীয় বিদ্বেষের ঘটনা, আর কোনটা নিছক অর্থলোভ জনিত—তাও বিশ্লেষণ করে দেখা হয়নি। আমাদের ইতিহাস বইতে ধরেই নেওয়া হয়েছে, মুসলিম শাসকরা যখন হিন্দু মন্দির ভেঙেছে, তা ধর্মীয় বিদ্বেষ প্রসূত। তার পেছনে আর কোনো কারণ থাকতে পারে না। অথচ, অওরঙজেব যে গোলকুণ্ডায় গিয়ে লুকিয়ে রাখা রাজস্ব আদায় করতে মসজিদও ভেঙে দিয়েছিলেন [Ibid, 51], সেই খবরটি ইতিহাস বইপত্রে থাকে না। এটাও কেউ ভেবে দেখেননি, নাদির শাহ গুজরাতের সোমনাথ মন্দির যে এগার বার আক্রমণ করেছিলেন, তা কিসের আশায়। নিছক ধর্মীয় বিদ্বেষে ভাঙতে হলে তো একবারই যথেষ্ট ছিল। আসলে সেই সব মন্দিরে রাজ্যের সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে বছর বছর যে কত সোনা মজুত করা হত, তার কি কখনও হিসাব করা হয়েছে? খোঁজ করা হয়েছে কি, এই অঢেল সম্পদ আসত কোত্থেকে এবং কীভাবে?

৫) ভারতবর্ষের বহু বড় বড় মন্দিরের ইট-পাথরের জাঁকজমক, স্থাপত্যের ঠাটবাটের তলায় চাপা পড়ে আছে এদেশের হাজার হাজার ইতিহাস-বর্জিত নারীর নীরব অশ্রু-রক্ত-কান্না। সেই সমস্ত নারী—যাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে জোর করে অথবা টাকাপয়সার লোভ দেখিয়ে তুলে এনে মন্দিরের দেবদাসী বানানো হত, তারপর চলত দেবতার নামে তারই ইহজাগতিক প্রতিনিধি পাণ্ডা পুরোহিত রাজা-জমিদারদের তরফে জীবনভর যৌন নির্যাতন। পুরুষতান্ত্রিক আধ্যাত্মিক পারমার্থিক মহান হিন্দু ধর্ম তখন আত্মপ্রকাশ করত সামাজিকভাবে শংসিত বা অনুমোদিত ধর্মীয় পুরুষতন্ত্র রূপে। শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর “দেনা-পাওনা” উপন্যাসে এই ধর্মীয় কদাচারের একটুখানি আভাস মাত্র দিতে পেরেছিলেন।

এমনকি, এই রকম একজন হিন্দু রমণী কচ্ছের রাণির উপর হিন্দু মন্দির সেবকদের হীন লাঞ্ছনার ঘটনাতে ক্রুদ্ধ হয়ে এবং সহযোগী হিন্দু রাজাদের অনুরোধেই যে অওরঙজেব কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের একটা অংশ ভেঙে ফেলার আদেশ দিয়ে দিয়েছিলেন [Ibid, 51; Sitaramayya 1946, 177-78], আমাদের ইতিহাসের পাঠ্য পুস্তকগুলি সেই সামান্য তথ্যটিও জানাতে ভুলে যায়। কাকে বাঁচাতে? সাধে কি আর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কাশীতে বাবা-মাকে দেবদর্শন করাতে নিয়ে গিয়েও নিজে একটাও মন্দিরের দরজায় পা রাখতে রাজি হননি!

৬) ভারতবর্ষের সমস্ত হিন্দু মন্দিরে হিন্দুদের সংখ্যালঘু তথাকথিত উচ্চবর্ণের লোকেরা অর্থ ও প্রতিপত্তির জোরে সংখ্যাগুরু তথাকথিত নিম্নবর্ণের লোকেদের কখনও ঢুকতে দিত না, গ্রামের প্রধান রাস্তা দিয়ে চলতে দিত না, ভালো গভীর কুঁয়ো বা পুকুর থেকে জল তুলতে দিত না, অস্পৃশ্য বলে গ্রামের বাইরে সবচাইতে খারাপ জায়গায় বসবাস করতে বাধ্য করত [বিবেকানন্দ ১৯৮৬, ৫/২৬২]—এই সব তথ্য কোনো ইতিহাস বইতে লেখা থাকে না। সমস্ত প্রাচীন পবিত্র হিন্দু ধর্মশাস্ত্র—বেদ উপনিষদ ব্রহ্মসূত্র স্মৃতিশাস্ত্র রামায়ণ মহাভারত গীতা—ইত্যাদিতে যে এই ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতিভেদপ্রথার সপক্ষে নির্লজ্জ প্রচার চালানো হয়েছে, এই বর্বর প্রথা যে কোনো ভালো প্রথার পরবর্তীকালে বিকৃত রূপ নয়, আদিতেই সে এই জঘন্য বিভেদ-বিদ্বেষ সঙ্গে নিয়ে প্রচলিত হয়েছিল—কোনো ইতিহাস গ্রন্থ তা সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের জানবার সুযোগ করে দেয়নি। তাদের পড়ানো ও শেখানো হয়—সমস্ত হিন্দুশাস্ত্রগুলি নাকি প্রথম থেকেই প্রেম ভক্তি বৈরাগ্য অহিংসা সহিষ্ণুতা সকল-নরে নারায়ণ-দর্শন আত্মা-পরমাত্মার মহামিলন এবং উচ্চতম আধ্যাত্মিক ভাবেরই একেবারে খাঁটি নলেন গুড়!

৭) আমাদের দেশে রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দকে নিয়ে অনেক গর্ব করা হয়। অথচ যে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরে রামকৃষ্ণ পূজার্চনা করেছেন, বিবেকানন্দের মতো শিষ্য সংগ্রহ করেছেন, সেই মন্দির একদিন হিন্দু মাতব্বররাই গড়তে সাংঘাতিক বাধা দিয়েছিল। জমিদাররা জমি পর্যন্ত বিক্রি করতে চায়নি, ব্রাহ্মণরা সেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে বা সেখানে পূজা করতে যেতেও রাজি হয়নি। কেন না, মন্দিরের প্রতিষ্ঠাত্রী রাণি রাসমনি ছিলেন হিন্দু শাস্ত্রর মাপকাঠিতে শূদ্রাণি, জাতে কৈবর্ত। তাঁর নাকি মন্দির প্রতিষ্ঠার অধিকারই নেই। তাঁকে জমি কিনতে হয়েছিল একজন ইংরেজের কাছ থেকে, মন্দির প্রতিষ্ঠার অধিকার তিনি পেয়েছিলেন একজন ব্রাহ্মণকে মন্দিরস্বত্ব নিঃশর্তে দান করে। নেহাত গরিব না হলে গদাধর রামকৃষ্ণও হয়ত সেখানে পুজো করতে আসতেন না। পাঠ্যপুস্তকে, সহায়ক বইপত্রে, এমনকি রামকৃষ্ণ মিশনের বইপত্রেও দক্ষিণেশ্বর নিয়ে কত কাব্যভাব ভক্তিভাব ব্যক্ত হয়; কিন্তু হিন্দু ধর্মের মাতব্বরদের সেদিনকার এই কুৎসিত আচরণের তথ্যগুলি কেউ কোথাও লেখে না। বর্তমান প্রজন্মকে তারা এই সব সত্য জানতে দিতে চায় না।

৮) মোগল যুগে দক্ষিণ-পশ্চিম মারাঠা সাম্রাজ্য এবং উত্তর ভারতে শিখ শক্তির অভ্যুত্থানকে স্রেফ মুসলিম বাদশাহদের সাথে সংঘর্ষের কারণে প্রচুর গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। “জাতীয় গৌরব” হিসাবে চিত্রিত করা হয়ে থাকে। অথচ, বাংলাদেশে শিবাজি ও তাঁর প্রধান অনুচর ভাস্কর পণ্ডিতের বাহিনী বারবার এসে যে লুঠতরাজ চালাত, তাতে তাঁদের পরিচয় হয়েছিল বর্গি ডাকাত হিসাবে। [রায় ১৯৮৯, ১১শ] আর এই দুই রাজশক্তি সম্পর্কে এমনকি বিবেকানন্দ পর্যন্ত বলেছিলেন, “মহারাষ্ট্র বা শিখ সাম্রাজ্যের উত্থানের প্রাক্কালে যে আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়েছিল তা ছিল সম্পূর্ণ প্রতিক্রিয়াশীল। . . . মোগল দরবারেও তদানীন্তনকালে যে প্রতিভা ও বুদ্ধিদীপ্তির গৌরব ছিল, পুণার রাজদরবারে কিংবা লাহোরের রাজসভায় বৃথাই আমরা সেই দীপ্তির অনুসন্ধান করে থাকি। মানসিক উৎকর্ষের দিক থেকে এই যুগই ভারত-ইতিহাসের গাঢ়তম তমিস্রার যুগ এবং এই দুই ক্ষণপ্রভ সাম্রাজ্য ধর্মান্ধ গণ অভ্যুত্থানের প্রতিনিধি স্বরূপ ছিল, . . .।” [বিবেকানন্দ ১৯৮৬, ৫/৩০৭]

৯) আকবরের সাথে রাণা প্রতাপের ও অওরেঙজেবের সঙ্গে শিবাজির যুদ্ধ ছিল বড় ও ছোট দুই সামন্তী শাসকের পারস্পরিক রাজ্য রক্ষা ও বিস্তারের সংঘর্ষ; অথচ সেগুলিকে আমাদের ইতিহাসের বইতে দেখানো হয়ে এসেছে বিদেশি বনাম জাতীয় শক্তির সংগ্রাম হিসাবে। আর এই বিদেশি মানে হল মুসলমান এবং জাতীয় মানে হল হিন্দু। অথচ দেশ জাতির ভারতীয়ত্ব-সূচক উপলব্ধি আমাদের ধারণায় এসেছে ঊনবিংশ শতাব্দে, সিপাহি বিদ্রোহের সামান্য পরে। তার আগে পর্যন্ত দেশ মানে ছিল শুধুই নিজের গ্রাম; তার বাইরে গেলেই ভিন্‌দেশি, পরদেশি। বিদেশ-বিভুঁই। তাছাড়া, আকবর এবং অওরঙজেব—উভয়েরই সেনাবাহিনীতে একটা বড় অংশই ছিল হিন্দু। বস্তুত, মোগল সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করেছিল রাজপুত রাজাদের অধিকাংশের সমর্থন ও সাহায্য নিয়ে। একই ভাবে, রাণা প্রতাপ ও শিবাজির বাহিনীতেও অনেক সেনা এবং সেনাপতিই ছিল মুসলমান। এদের মধ্যে যুদ্ধ যা কিছু হয়েছে তা নিজ নিজ শাসনাধীন সামন্তী এলাকা রক্ষা ও বিস্তার নিয়ে। এর সাথে হিন্দু মুসলমানের কোনো সাম্প্রদায়িক বা অন্য কোনো ধরনের স্বার্থ জড়িত ছিল না।