বাংলাদেশ এরই অন্তর্ভুক্ত একটি অঞ্চল, যাকে বিশ্ব সন্ত্রাসের উর্বর ভূমি বানানোর চেষ্টাও খুব জোরদার বলে মনে হয়।

June 20, 2024

২০০১ এর আগে ইরাক লিবিয়া সিরিয়ায় আল কায়েদা বা তালেবান ধারার কোন কিছুর অস্তিত্ব ছিলো না। তথাকথিত ‘সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ’ এই অঞ্চলকে চেনা অচেনা সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। সর্বশেষ এই অঞ্চলে বিরাট শক্তি ও সম্পদ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে আইসিস যা ইসলামী রাষ্ট্র বা খিলাফৎ প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। নতুন শত শত গাড়ি, বার্ষিক ১৬ হাজার কোটি টাকার বাজেট এবং প্রায় ৩০ হাজার সশস্ত্র সদস্য নিয়ে আচমকা তারা হাজির। তারা ইরাক, সিরিয়ায় একের পর এক অঞ্চল দখল করছে। তারা একের পর এক ভিন্নধর্ম ও মতাবলম্বী, সংখ্যালঘু জাতির মানুষদের ধরছে, গলা কাটা ও নির্যাতনের দৃশ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রচার করছে। হঠাৎ করে এরকম একটি বিশাল বাহিনীর জন্ম এবং ক্রমান্বয় বিজয় আফগানিস্তানে তালিবানদের আচমকা আবির্ভাব এবং দ্রুত আফগানিস্তান দখলের কথা মনে করিয়ে দেয়।

ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ছিন্নভিন্ন হবার ফলে এই দেশগুলোর মানুষদের নারকীয় অনিশ্চিত অবস্থায় পড়তে হয়েছে। ইউরোপে অভিবাসনে বিশাল স্রোত এরই ফলাফল। অন্যদিকে এর প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী তিনপক্ষ: সৌদী আরব, ইজরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। তাদের কাছে ইরাকের সাদ্দামের অপরাধ স্বৈরশাসন ছিলো না ছিলো তেল ক্ষেত্র জাতীয়করণ এবং সামরিক শক্তি হিসেবে সৌদী আরব ও ইজরায়েলের কর্তৃত্ব অস্বীকারের ক্ষমতা। লিবিয়ার গাদ্দাফিরও একই অপরাধ ছিলো। সৌদী রাজতন্ত্র বরাবরই তার ওপর গোস্বা ছিলো। জীবনের শেষ পর্যায়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক গড়ার লক্ষ্যে ‘নয়া উদারতাবাদী’ বলে পরিচিত পুঁজিপন্থী কিছু সংস্কারের পথে গেলেও গাদ্দাফীর বড় অপরাধ ছিলো সৌদী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্পষ্ট আক্রমণাত্মক কথাবার্তা। ২০১১ সালে গাদ্দাফী সরকারকে উচ্ছেদ করবার জন্য ন্যাটো বাহিনীর ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি এবং আল কায়েদাসহ বিভিন্ন ভাড়াটিয়া ইসলামপন্থীদের জড়ো করার কাজটি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা কয়েকটি দেশ ও সৌদী আরবের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।

সিরিয়ার আসাদ সরকারেরও অপরাধ স্বৈরশাসন নয়, অপরাধ সৌদী আরব-ইজরাইল অক্ষের কাছে তার অগ্রহণযোগ্যতা। সিরিয়ার আসাদ সরকার উচ্ছেদের জন্য অতএব বিভিন্ন ক্ষুদ্ধ গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয় পশ্চিমা শক্তি ও সৌদী-কাতার-জর্ডান রাজতন্ত্র। ইরানকে কাবু করাও এর একটি উদ্দেশ্য ছিলো। আসাদ বিরোধী এসব গোষ্ঠীর অধিকাংশই আল কায়েদা ঘরানার বিভিন্ন গ্রুপ, ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী। সৌদী আরব, কাতার, তুরস্ক, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বিপুল অর্থ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র যোগানের ওপর ভর করেই এসব গোষ্ঠী শক্তিপ্রাপ্ত হয়। এর সাথে মার্কিন, ব্রিটিশ, ফরাসি ও ইজরায়েলী গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত ভূমিকা ছিলো উল্লেখযোগ্য। এদেরই অনেকে এখন গঠন করেছে আইসিস। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট বাইডেন কিছুদিন আগে এক বক্তৃতায় মুখ ফসকে আইসিস এর পেছনে এই দেশগুলোর শত হাজার কোটি ডলার সহ নানা পৃষ্ঠপোষকতার কথা বলে ফেললেও পরে মিত্রদের ক্ষোভের মুখে মাফ চেয়েছেন। বাইডেন অবশ্য নিজেদের ভূমিকার কথা বলেননি। কিন্তু সত্য ঢাকা পড়েনি।

‘মৌলবাদ’কে একটি গ্রামীণ, অনাধুনিক, পশ্চাৎপদ বিষয় হিসেবে দেখলে এর শেকড় সন্ধান পাওযা যাবে না, এর ব্যাপ্তি বোঝানো যাবে না। মার্কিন ইসলামবিষয়ক পন্ডিত আমিনা ওয়াদুদ এর মতে ‘ইসলামপন্থীদের বর্তমান পুনরুত্থান একটি উত্তর-আধুনিক ঘটনা’। যেভাবেই বলি না কেনো, ‘মৌলবাদী’ শক্তিগুলোর ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভাবকে নিছক স্থানীয় বা জাতীয় বিষয় হিসেবে দেখা চলে না। তথ্য যুক্তি দিয়েই তারিক আলী দেখিয়েছেন যে, ‘বর্তমান সময়ে সবচাইতে বড় ‘মৌলবাদ’, ‘সকল মৌলবাদের জন্মদাতা’ হলো- মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ’।

তাই এটা বিস্ময়কর নয় যে, একইসাথে ‘সন্ত্রাস বিরোধী তৎপরতা’র নামে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে, অস্ত্র যোগান বাড়ছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর হচ্ছে, নতুন নতুন দৃশ্যমান অদৃশ্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে, গোয়েন্দা সংস্থার দাপট বাড়ছে, সন্ত্রাস বাড়ছে, তা দমনে নতুন নতুন দমন পীড়নের আইন, বিধিনিষেধ তৈরি হচ্ছে। যারা সবচাইতে বড় সন্ত্রাসী তারাই বিশ্বজুড়ে দাপাচ্ছে ‘সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ’ নাম দিয়ে। বাংলাদেশ এরই অন্তর্ভুক্ত একটি অঞ্চল, যাকে বিশ্ব সন্ত্রাসের উর্বর ভূমি বানানোর চেষ্টাও খুব জোরদার বলে মনে হয়।