প্রগতিশীলতা বনাম মৌলবাদ: বাংলাদেশের ‘বাইনারি’ রাজনীতি

November 22, 2023

বাজি ধরে বলতে পারি, এই লেখাটার শিরোনাম দেখেই বিরাট একটা অংশের মানুষ রিলাকটেন্ট হয়ে যাবে এই সন্দেহে যে এটি আসলে কাদের পক্ষে লেখা হয়েছে? প্রগতিশীলদের পক্ষ নিয়ে না র্ধমীয় মৌলবাদীদের পক্ষ নিয়ে? মানে আপনাকে কোনো না কোনো পক্ষে হাজিরা দিতেই হবে, যেন এই চিন্তার কোনো মধ্যপন্থা নাই। এই যে দেখেন ‘হাজিরা’ শব্দটা ব্যবহার করলাম এইখান থেকেও একদল সিদ্ধান্ত টানবে এইটা ইসলামপন্থীদের পক্ষ নিয়ে আসলে লেখা হয়েছে। তার মানে এই পোলারাইজেশনটা এমন একটা অবস্থায় দাড়িয়েছে যে ব্যক্তির শব্দ চয়ন থেকেও একদল মানুষ এই সিদ্ধান্ত নেয় যে, এই লেখা বা প্রস্তাবনা কাদের পক্ষে যায় বা যাচ্ছে। মানে শব্দেরও হিন্দুয়ানী, মুসলমানী এই ধরনের চরিত্রায়ন করেছি আমরা। অথচ যে কোনো জনগোষ্ঠীর ভাষা হচ্ছে প্রবাহমান, এইটা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হতে থাকে। সময়ের সাথে সাথে কথিত ভাষার বিভিন্ন ফর্মে এডাপটেশন ঘটে। তারই অংশ হিসেবেই একটি জাতিগোষ্ঠী ভাষার মধ্যে বিভিন্ন গোত্রের বা এথনিক গ্রুপের ভাষার মিশ্রন ঘটতে থাকে। এর অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যাবে। ইন-অরগানিকভাবে বা জোরপূর্বক যদি কোন শব্দ আমদানিও করা হয় সেই শব্দ জাতিগোষ্ঠী নিজের করে না নিলে, সেই শব্দ ওই জনপদে টিকেও না, হারিয়ে যায়। কিন্তু ভাষা কেন্দ্রিক এই আলোচনায় না যেয়ে আমরা সরাসরি সিদ্ধান্তে চলে যাই এইটা হিন্দুয়ানি শব্দ না মুসলিম শব্দ। মানে চিন্তা করে দেখেন চিন্তা করার পদ্ধতিকে আমরা কি পরিমান সংকীর্ণ করে ফেলেছি যে শব্দ চয়ন দিয়ে বুঝতে চাই এর লেখা আমার পক্ষে যাবে না বিপক্ষে। তার মানে এই বাইনারি চিন্তা পদ্ধতি প্রথম যে কাজটি করে এবং করেছে সেইটা হচ্ছে ব্যক্তির চিন্তাকে সংকীর্ণ করে ফেলে। চিন্তাকে ন্যারোডাউন করে দুই পাড়-ওয়ালা নালার মধ্যে দিয়ে পরিচালিত করে। তারপর চিন্তা বাধ্য হয় নালা যেদিকে গেছে সেই দিকেই যেতে। এর আর অন্য কোনো গত্যান্তর থাকে না।

এখন এই বাইনারি চিন্তা পদ্ধতিটা আসলে কি?

এইটা আসলে আমরা জানি। বাই মানে দুই। মানে কম্পিউটার সফটওয়ার প্রগ্রামিং এর জন্য বেসিক যে ০ এবং ১ এই দু্ইটা ডিজিট ব্যাবহার করা হয় এইটাকে বলে বাইনারি কোড, কারন দু্ইটামাত্র ডিজিট ব্যাবহার করে এই কোডিং করা হয় তাই এইটাকে বাইনারি কোড বলে। তারপর আপনি যত জটিল, যত ডিটেইল প্রগ্রামিংই করেন না কেন এই দু্ইটা নাম্বার ব্যাবহার করেই করবেন। এবং এই বেসিক কোডে ০ এবং ১ এর পরে কোনদিনও ২ আসবে না। তৃতীয় কোনো কোড বানাতে হলে আপনাকে ১১ বা ০০ বা ০১ এইভাবেই বানাতে হবে। বাইনারী চিন্তা-পদ্ধতিও তাই। বাইনারী চিন্তা পদ্ধতি হচ্ছে একটা শর্তযুক্ত চিন্তা পদ্ধতি যেখানে আপনার চিন্তাকে এমনভাবে শর্তযুক্ত করা হয় যে আপনি দু্ইটা অপশনের বাইরে আর কিছু দেখবেন না। সাদা বা কালো, ভালো বা মন্দ, ডান বা বাম, নাস্তিকতা বা আস্তিকতা, লীগ বা বিএনপি, ফুটবল বা ক্রিকেট, আবাহনী বা মোহামেডান, আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল এই রকম করে প্রতিনিয়ত আপনাকে এমন একটি চিন্তা পদ্ধতিতে অভ্যস্ত্য করা হয় যেইটাতে অভ্যস্ত হলে আপনি ‘হয় এইটা নয় ওইটা’ এইভাবেই ভাববেন। বাইনারী চিন্তা পদ্ধতি বিপদ যে ঘটায় যেটা শুরুতেই বলেছি, চিন্তার শুরুতে এবং শেষে একটা ব্র্যাকেট টেনে দেয় মানে ওই যে দু্ই পাড়-ওয়ালা নালার কথা বললাম তাই। আপনার চিন্তাকে বাইনারি চিন্তা-পদ্ধতি গাইড করে নিয়ে যেয়ে ঠিক নালার সেই যায়গাতেই ফেলবে যেই যায়গায় নালার সীমানা নির্ধারন করা আছে। চাইলেও আপনি শর্তযুক্ত চিন্তা পদ্ধতির কারনে অন্য কিছু ভাবতে পারবেন না।