এরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে পেট্রোডলার যেমন এনেছে, একইভাবে সৌদি ওয়াহাবি সংস্কৃতি ও জীবনধারাও বাংলাদেশে আমদানি করেছে

June 2, 2021

এরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে পেট্রোডলার যেমন এনেছে, একইভাবে সৌদি ওয়াহাবি সংস্কৃতি ও জীবনধারাও বাংলাদেশে আমদানি করেছে। বাংলাদেশে ইসলামের আগমন ঘটেছে এক হাজারেরও বেশি বছর আগে। সুফী সাধকরা বাংলাদেশসহ গোটা উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সাধারণভাবে স্থানীয় ধর্ম, সামাজিক ও লৌকিক রীতিনীতির সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হননি। তাদের ইসলামে এক ধরনের সমন্বয়ের উদ্যোগ ছিল। প্রচলিত হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্ম এবং লোকায়ত সংস্কৃতির অনেক উপাদান তারা গ্রহণ করেছিলেন। যে কারণে ভারতবর্ষে ইসলাম এত দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। কট্টরপন্থী ওয়াহাবি মোল্লারা বিভিন্ন সময়ে ইসলাম ধর্মকে শুদ্ধিকরণের চেষ্টা করেছেন বটে তবে বাংলার মানুষ ধর্মের নামে উগ্রতা কিংবা গোঁড়ামি কখনও অনুমোদন করেনি। এমনকি হাজী শরিয়তউল্লাহদের হিন্দু জমিদার ও ইংরেজবিরোধী ওয়াহাবি বা ফারায়েজি আন্দোলন মুসলমান কৃষক কিংবা শহুরে মধ্যবিত্তের কিছু সমর্থন পেলেও তাদের ধর্ম সংস্কারের কট্টর দাবির প্রতি তেমন জনসমর্থন কখনও ছিল না। ওয়াহাবিরা মিলাদ ও মাজার জেয়ারতকে যতই বেদাত বা পূজা বলুক না কেন সাধারণ মানুষ কখনও তা সমর্থন করেনি। সৌদি ওয়াহাবি সংস্কৃতির আগ্রাসনের কারণে বাংলাদেশের চিরায়ত বাঙালী সংস্কৃতি আজ হুমকির সম্মুখীন। তরুণরা আকৃষ্ট হচ্ছে ‘আল কায়দা’, ‘আইএস’-এর ইসলামের নামে সন্ত্রাসের প্রতি। ১৯৭৫ এর পর বাংলাদেশে সৌদি বোরখার আমদানি শতগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। হজের মৌসুম ছাড়াও প্রতি বছর হজযাত্রীর সংখ্যা বাড়ছে। পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে কথ্য ভাষার ক্ষেত্রেও। সত্তর দশকেও মুসলমানরা বিদায় নেয়ার সময় ‘খোদা হাফেজ’ বলতেন। ‘খোদা হাফেজ’, এখন ‘আল্লাহ হাফেজ’ হয়ে আর বিভাষীদের হাসির খোয়াক জোগাচ্ছে। নামাজকে এখন ‘সালাত’ বলা হচ্ছে। রমজান মাসকে বলা হচ্ছে ‘রামাদান। রোজাকে আরবিতে ‘সিয়াম’ বলা হচ্ছে। বাংলা কথ্যভাষার আঙ্গিনায় ‘ইনশাল্লাহ’, ‘মাশআল্লাহ’, ‘সোবহান আল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ যেভাবে অনুপ্রবেশ করেছেÑ যেন আরবি ভাষা ছাড়া অন্য কোনও ভাষা আল্লাহ বোঝেন না। ‘খোদা’ ফারসি শব্দ হওয়ায় ‘আল্লাহ’কে ‘খোদা’ সম্বোধন করা ওয়াহাবি সংস্কৃতিতে নাজায়েজ হয়ে গেছে। মাথায় ঘোমটা দিলে চলবে না, শাড়ির সঙ্গে মেয়েদের হিজাব পরা ক্রমশ বাধ্যতামূলক হয়ে যাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় ‘হিজাব সুন্দরী’ প্রতিযোগিতা হচ্ছে, শিরোপা দেয়া হচ্ছে শ্রেষ্ঠ হিজাব পরিধানকারীদের। কয়েক বছর আগে হাটহাজারির এক গ্রামে শুটিং করতে গিয়ে অভিনব অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ‘জিহাদের প্রতিকৃতি’ প্রামাণ্যচিত্রে মায়ানমারে জিহাদ করতে গিয়ে ‘শহীদ’ হয়েছে এমন এক তরুণের পিতার সাক্ষাতকার ধারণ করার জন্য আমরা দুর্গম সেই গ্রামে গিয়েছিলাম। দুর্গম বলছি এ কারণে যে গাড়ি নিয়ে সেখানে যাওয়া যায় না। আমরা দুটি ক্যামেরা, স্ট্যান্ড, লাইট নিয়ে সাত-আটজন যাচ্ছিলাম। গ্রামের দিক থেকে আসা দুজন বোরখাধারী মহিলা আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন। আমরা তাদের চেহারা না দেখলেও তারা আমাদের বিলক্ষণ দেখেছিলেন। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের কথোপকথন কানে এল। একজন তার সঙ্গিনীকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাংলায় প্রশ্ন করেছিলেনÑ এরা আমাদের গ্রামে ক্যামেরা নিয়ে কোথায় যাচ্ছে? আমাদের গ্রামে তো সবাই ওয়াহাবি। সঙ্গিনী জবাব দিয়েছিলেনÑ বোধহয় আমাদের গ্রামে কেউ সুন্নি হয়ে গিয়েছে। আমার ধারণা ছিল ওয়াহাবিবাদ বুঝি শহুরে শিক্ষিতজনের চর্চার বিষয়। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যে এর শেকড় বিস্তৃত হয়েছে হাটহাজারির সেই গ্রামে না গেলে জানতে পারতাম না। তবে সব বোরখাধারিণী ওয়াহাবি এটা মনে করার কোন কারণ নেই। নির্বাচনের সময় গ্রামে গ্রামে জামায়াতি এনজিওগুলো বিনামূল্যে মহিলাদের বোরখা ও ছেলেদের গলায় ঝোলানোর স্কার্ফ দেয়। যে মেয়ের বাইরে পরার মতো একখানা শাড়ি নেই, সে বিনামূল্যে পাওয়া বোরখা স্বাভাবিকভাবেই লুফে নেবে। তবে এভাবে যে হিজাব বা বোরখার প্রতি আসক্তি ক্রমশ বৃদ্ধি পাবে এতেও কোনও সন্দেহ নেই। সৌদি ওয়াহাবি সংস্কৃতির আগ্রাসন প্রতিহত করতে হলে অসাম্প্রদায়িক বাঙালী সংস্কৃতির প্রসার ঘটাতে হবে। মৌলবাদ মনোজগতে অন্ধকারের আধিপত্য বিস্তার করে। সাম্প্রদায়িকতা মানুষের মনকে সঙ্কীর্ণ থেকে সঙ্কীর্ণতর করে যাবতীয় মানবিক মূল্যবোধ ধ্বংস করে। চেতনার জগতে অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর লড়াই তীব্রতর করতে হলে, মানুষের ভালবাসা ও সহমর্মিতা পেতে হলে মানুষকে ভালবাসতে হবে শর্তহীনভাবে। মানুষের সকল আচরণ ও কার্যক্রমের সীমানা নির্ধারিত রয়েছে। নিজের বিশ্বাস, আচরণ বা কর্মকা- যদি অন্যের ক্ষতির কারণ হয় কিংবা হৃদয়বৃত্তি সঙ্কুচিত করেÑ তা অবশ্যই পরিহার করতে হবে। রাষ্ট্রের আচরণ ও বিধান যা সংবিধানে লিপিবদ্ধ থাকে, তা যত উদার ও গণতান্ত্রিক হোক না কেন মনোজগতে ধর্মনিরপেক্ষ মানবিকতার আধিপত্য স্থায়ী না হলে অন্ধকারের বোধ ব্যক্তি থেকে সমাজে, সমাজ থেকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় সংক্রমিত হয়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ড. কুদরতে খোদার নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন। কমিশন সুপারিশ করেছিলÑ রাষ্ট্রের চার মূলনীতি শুধু সংবিধানে থাকলে চলবে না। বিদ্যালয়ের প্রাথমিক পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শ্রেণী পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তারা সংবিধানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একমুখী শিক্ষানীতি প্রণয়নের প্রস্তাব করেছিলেন। কুদরতে খোদা শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের আগেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে তাঁর শিক্ষানীতিকে চিরদিনের জন্য মর্গে পাঠিয়ে বাংলাদেশে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটানো হয়েছে। অধ্যাপক কবীর চৌধুরী ছিলেন ড. কুদরতে খোদা শিক্ষা কমিশনের সদস্য সচিব। ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তাঁর শিক্ষক অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন। এই কমিশন একমুখী শিক্ষার প্রস্তাব না করলেও মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার সুপারিশ করেছিল। মাদ্রাসা শিক্ষকদের সংগঠন হেফাজতে ইসলামসহ তাবৎ মৌলবাদীদের প্রচ- বিরোধিতার কারণে কবীর চৌধুরী শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। হেফাজতে ইসলাম কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি আদায় করে নিলেও তাদের পাঠক্রমে সরকারী হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করছে। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো হেফাজতিদের দাবির কারণে সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িক বিবেচনা থেকে সাধারণ পাঠক্রম থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কিছু উজ্জ্বল নির্দশন বাদ দেয়া হয়েছে। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার করাল থাবা থেকে কোমলমতি শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। আমাদের শিশু-কিশোর-তরুণদের মৌলবাদের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে হলে ধর্মনিরপেক্ষ, মানবিক ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষানীতির বিকল্প কিছু নেই। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে মোকাবেলার পাশাপাশি ধর্মতত্ত্ব দিয়েও মোকাবেলা করতে হবে। মওদুদী, বান্না, ওয়াহাব, প্রমুখ ইসলামকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, যার অবস্থান সুফীদের মানবিক ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীতে। ইসলামসহ অন্য সব ধর্মে মানবপ্রেম, উদারনৈতিকতা ও শান্তির কথা যেমন বলা হয়েছে, এর পাশাপাশি ধর্মরক্ষার জন্য জিহাদ, ক্রুসেড, ধর্মযুদ্ধ ইত্যাদির কথাও বলা হয়েছে, যা বর্তমান বিশ্বে কোনও অবস্থায় প্রযোজ্য নয়। ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের অনুধাবন করতে হবে মওদুদী, বান্না ওয়াহাবের উগ্র ইসলাম বা ইসলামের নামে সন্ত্রাস প্রতিহত না করলে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, একইভাবে ধর্মের মহিমাও ক্ষুণœ হবে। ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার পক্ষে যেমন আমাদের দাঁড়াতে হবে, একইভাবে ধর্মীয় মানবতারও পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। মানবতা আস্তিকতায় যেমন আছে নাস্তিকতা ও অজ্ঞেয়বাদেও আছে। আমাদের চতুর্দশ শতকের কবি চন্ডিদাস যেমন লিখেছেন- ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’, একইভাবে লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলও মানবতার জয়গান গেয়েছেন। চন্ডিদাসের প্রায় দেড়শ বছর আগে তুরস্কের সুফী কবি জালালউদ্দিন রুমী লিখেছেন- ‘সব ধর্মেই ভালবাসার কথা আছে, কিন্তু ভালবাসার কোনও ধর্ম নেই। আমার ধর্ম হচ্ছে ভালবাসা, প্রতিটি মানবহৃদয় আমার উপাসনাস্থল’। রুমীর পাঁচশ বছর পর লালন লিখেছেন- ‘সহজ মানুষ ভজে দেখ না রে মন দিব্যজ্ঞানে।’ ধর্ম-বর্ণ-ভাষা-জাতিসত্তা-আঞ্চলিকতা নিয়ে অহঙ্কার ও উগ্রতা মানুষকে অন্তিমে পশুতে রূপান্তরিত করে, সন্ত্রাস ও হানাহানি অনিবার্য করে তোলে; যা সমাজ ও সভ্যতা ধ্বংসের কারণ হয়। আমরা মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকারের পথে হাঁটব না কি শান্তি ও মানবিকতার আলোর পথে হাঁটব- এ সিদ্ধান্ত নিতে হবে তরুণ সমাজকে, যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। গত শতাব্দীতে ভাষা আন্দোলন থেকে আরম্ভ করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাংলাদেশের তরুণরা দেশ ও জাতির সকল সঙ্কট ও ক্রান্তিকালে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের চেতনায় আলোকিত হয়ে নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে- ভবিষ্যতেও যে তা করবে প্রত্যাশা অমূলক নয়। ৩০ লাখ মানুষের জীবনের মূল্যে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ আমরা অর্জন করেছি। মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার সকল প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করে আমাদের দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে হবে।