মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা শুধু বাংলাদেশ কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার সমস্যা নয়, সমগ্র বিশ্ব আজ জঙ্গী মৌলবাদী সন্ত্রাসের হিংস্র থাবায় ক্ষতবিক্ষত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন দেশে উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অধিকারবঞ্চিত নিপীড়িতজনের সংগ্রাম এবং স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভ্যুদয় মানুষের চৈতন্যে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক চেতনার পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক মূল্যবোধ মানুষের মনোজগতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। গত শতাব্দীর আশির দশকের শেষ পর্বে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বিপর্যয় দেশে দেশে শোষণ ও বৈষম্যমূলক অমানবিক ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে যেমন শক্তিশালী করেছে- মনোজগতেও মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকার ক্রমশ গাঢ় হয়েছে। গত তিন দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দক্ষিণপন্থার ক্ষেত্র ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে, এবং বামপন্থার ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হচ্ছে। মরক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত মুসলিমপ্রধান দেশসমূহে সত্তরের দশকের শুরু থেকেই ধর্মীয় গোঁড়ামি, উগ্রতা এবং ইসলামের নামে সন্ত্রাস বৃদ্ধি পাচ্ছে। মুসলিম বলয়ের যে সব দেশে বহুকাল ধর্মনিরপেক্ষ সরকার ক্ষমতায় ছিল, সে সব দেশে আজ মৌলবাদী কিংবা মৌলবাদবান্ধব সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল সেই দলের সরকার এখন মৌলবাদ ও উদারনৈতিকতার দোলাচলে অবস্থান করছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিস্ময়কর বিশাল বিজয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রাষ্ট্র পরিচালনার ম্যান্ডেট যেমন দিয়েছে, একইভাবে রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত শেকড় উপড়ে ফেলার ম্যান্ডেটও দিয়েছে। তবে এই শেকড় ওপড়ানোর প্রশ্নে সরকারের নীতিনির্ধারকদের ভেতর মতদ্বৈধতা রয়েছে। যদিও এ কথা সবাই স্বীকার করেন- মৌলবাদের শেকড় উৎপাটন না করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়া যাবে না। ১৯৭১ সালে বিশ্বের মানচিত্রে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামে যে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছিল তার মূলনীতি ছিল ‘গণতন্ত্র’, ‘সমাজতন্ত্র’, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’- যাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ৩০ লাখ মানুষকে শহীদ হতে হয়েছিল, যাদের স্বপ্ন ছিল এদেশে ধর্মের নামে কোনও শোষণ-পীড়ন-বঞ্চনা থাকবে না। ১৯৭২ সালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের কারণ হিসেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ধর্মের নামে হত্যা, শোষণ, পীড়ন বন্ধের জন্য এবং ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার জন্য ধর্মকে রাজনীতি ও রাষ্ট্র থেকে পৃথক রাখতে হবে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে গোটা জাতির প্রত্যাশা ছিল ভবিষ্যতে ধর্মের নামে গণহত্যা ও নারীনির্যাতনসহ যাবতীয় মানবতাবিরোধী অপরাধকে আর বৈধতা দেয়া হবে না, যেমনটি হয়েছিল ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালে। সেই প্রত্যাশা আজও অধরা রয়ে গেছে। একটি ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণের জন্য স্বাধীনতার বেদিমূলে ধর্ম-বর্ণ-ভাষা-বিত্ত-নির্বিশেষে ৩০ লাখ মানুষের আত্মাহুতির দ্বিতীয় উদাহরণ বিশ্বে আর কোথাও নেই। বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক মাথা উঁচু করে এ অহংকার করতেই পারে স্বাধীনতার জন্য, ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য সর্বোচ্চ মূল্য আমরা দিয়েছি, যদিও এ অহঙ্কার বার বার বিপর্যস্ত হয়েছে। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে আমাদের শত্রু ছিল পাকিস্তানের সামরিক জান্তা এবং তাদের এ দেশীয় দোসররা, যাদের প্রধান দলের নাম জামায়াতে ইসলামী। ১৯৪১ সালে অবিভক্ত ভারতবর্ষে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আবুল আলা মওদুদী (১৯০৩১৯৭৯)। প্রথম জীবনে তিনি একজন ধর্মপ্রচারক ও কোরান ও হাদিসের ব্যাখ্যাকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেও তার প্রকৃত লক্ষ্য ছিল ক্ষমতায় যাওয়া। ধর্মকে তিনি রাজনৈতিক মতবাদ প্রচারের হাতিয়ার মনে করতেন। নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য মওদুদী কোরাণ ও হাদিসকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন সেখানে আধ্যাত্মিকতার কোনও স্থান ছিল না। তিনি ধর্মকে ক্ষমতায় যাওয়ার বাহন বানিয়েছিলেন। তার মতে ধর্ম প্রচার করতে হলে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল করতে হবে, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য জিহাদ করতে হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আল্লাহর আইনের দ্বারা। মওদুদীর মতে জিহাদ বিধর্মীর বিরুদ্ধে যেমন পরিচালিত হতে পারে, স্বধর্মী যারা তাকে বা তার দলকে বাধা দেবে তাদের বিরুদ্ধেও হতে পারে এবং দুনিয়ায় আল্লাহর হুকুমত কায়েম করার জন্য প্রত্যেক মুসলমানকে তার দলে যোগ দিতে হবে, যে দল আল্লাহর সেনাবাহিনী হিসেবে কাজ করবে। ভারতবর্ষে যে সুফীসাধকরা শান্তি ও সহমর্মিতার ইসলাম প্রচার করেছিলেন, যারা ধর্মের নামে মানুষের ভেতর বিভাজন ও বৈষম্যের বিরোধী ছিলেন, মওদুদীর বিবেচনায় তারা ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে গিয়েছেন। যে কারণে সুফীদের মাজার জেয়ারত বা মাজারকেন্দ্রিক বিভিন্ন কার্যক্রমকে মওদুদী হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। গত দেড় দশকে মওদুদীর অনুসারীরা এই উপমহাদেশে সুফীদের বহু মাজারে বোমা হামলা করেছে, হত্যা করেছে মাজারে আগত শত শত ভক্তদের। মওদুদী গান বাজনাকেও হারাম বলেছেন, এমনকি সে গান যদি সুফীদের লেখা আল্লাহ বা রসুলের বন্দনাও হয়। মওদুদীবাদ ভিন্নমত, ভিন্নধর্ম, ভিন্ন জীবনধারা কোন কিছু বরদাশত করে না। ‘মুরতাদ কি সাজা’ পুস্তিকায় মওদুদী কোরান হাদিসের বিস্তর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন- এদের একমাত্র শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদ-। ইসলাম সম্পর্কে কট্টর ও রুক্ষ এই ধারণা মওদুদী আবিষ্কার করেননি। তার দু’শ বছর আগে আরবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মুহাম্মদ বিন আবদাল ওয়াহাব (১৭০৩-১৭৮২), যার অনুসারীরা ওয়াহাবি নামে পরিচিত। আধুনিক শিল্পবিপ্লবের যুগে, যখন ধর্মরাষ্ট্র, রাজতন্ত্র, উপনিবেশবাদ ও সামন্তবাদের শৃঙ্খল ভেঙে মানুষ নতুন রাজনৈতিক চেতনার দিগন্ত উন্মোচন করছে, তখন মুহাম্মদ বিন ওয়াহাব ইসলামকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এবং রাষ্ট্র পরিচালনার চাবিকাঠি ঘোষণা করে সৌদি রাজতন্ত্রের আদর্শিক ভিত নির্মাণ করেছিলেন। বর্তমান যুগে ইসলামের নামে রাজনীতি ও সন্ত্রাসের জন্মদাতা হচ্ছেন মুহাম্মদ বিন ওয়াহাব, যার মতবাদ ওয়াহাবিবাদ হিসেবে সুপরিচিত। রাজনৈতিক মতবাদ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মুহাম্মদ বিন ওয়াহাব ইসলামের শুদ্ধিকরণের জন্যও জিহাদকে আবশ্যিক ঘোষণা করেছিলেন। মাজার জেয়ারত, মিলাদ মাহফিল, সুফীদের আধ্যাত্মিক সাধনাÑ সব কিছু তার বিবেচনায় ছিল ইসলামবিরোধী। তিনি যথার্থভাবেই উপলব্ধি করেছিলেনÑ সুফীদের আধ্যাত্মিক মানবিক ইসলাম তার জঙ্গী মৌলবাদী রাজনৈতিক ইসলামের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হবে। মহানবী হযরত মুহাম্মদের প্রথম সাহাবাদের অন্যতম হযরত জায়েদ বিন আল খাত্তাবের (খলিফা হযরত উমরের অগ্রজ) মাজার ধ্বংসের জন্য ওয়াহাব রীতিমতো জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন এবং এ কাজে সৌদি রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ বিন সৌদের সঙ্গে চুক্তিও করেছিলেন। ১৯২৮ সালে মিশরের হাসান আল বান্না (১৯০৬-১৯৪৯) ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’ (ইখওয়ানুল মুসলেমিন) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাম্প্রতিক কালে উত্তর আফ্রিকায় যে ওয়াহাবি রাজনীতির সূচনা করেছেন, একই কাজ আবুল আলা মওদুদী করেছেন দক্ষিণ এশিয়ায় ‘জামায়াতে ইসলামী’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ‘ওয়াহাবিবাদ’ ও ‘মওদুদীবাদ’ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকলে বাংলাদেশ বা বিশ্বের অন্যত্র ইসলামী মৌলবাদ বা ধর্মের নামে সন্ত্রাস মোকাবেলার ব্যবস্থাপত্র প্রণয়ন করা সম্ভব হবে না। ॥ দুই ॥ ধর্মীয় মৌলবাদ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে দুই ধরনের বিচ্যুতি আমরা লক্ষ্য করি। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সর্বত্র সরকারের বিভিন্ন বাহিনী জঙ্গী মৌলবাদী সন্ত্রাসকে অন্য সব সন্ত্রাসের মতোই আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে। ‘আল কায়দা’, ‘আইএস’ বা ‘জামায়াতে ইসলামী’ যেন মাফিয়ার মতো সন্ত্রাসী সংগঠন, যা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নির্মূল করা যায়। এ কথা আমরা বার বার বলেছি ইসলামের নামে, বা অন্যান্য ধর্মের নামে বিশ্বব্যাপী যে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী কর্মকা- সংঘটিত হচ্ছে তা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও এই ধরনের সন্ত্রাস নির্মূলের জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক ও বহুমাত্রিক আদর্শিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম। ধর্মের নামে জঙ্গী মৌলবাদী সন্ত্রাস নির্মূলনের ব্যবস্থাপত্র প্রণয়নের ক্ষেত্রে আরেকটি বিচ্যুতি হচ্ছে ধর্মকে সম্পূর্ণভাবে খারিজ করা। এই মতবাদের প্রচার করা মনে করেন যেহেতু সন্ত্রাস বা সংঘাত সংঘটিত হচ্ছে ধর্মের নামে, সেহেতু ধর্ম যদি না থাকে তাহলে সন্ত্রাস বা সংঘাতও থাকবে না। ধর্মের নামে সন্ত্রাস মোকাবেলার এই ধারণা অনেকটা মাথাব্যথার উপশমের জন্য মাথা কেটে বাদ দেয়ার নিদানের মতো। বর্তমানে বিশ্বে সাতশ কোটি মানুষের ভেতর প্রায় ছয়শ কোটি মানুষ কোন না কোন ধর্মের অনুসারী, যারা ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার পছন্দ করেন না।