২০১৫ ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে ইসলামি মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠীর সবচেয়ে উর্বর সময়।

May 19, 2021

২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে বাংলাদেশে ইসলামবাদীদের দ্বারা এমন কিছু গুপ্ত হামলা ও হত্যা সংঘটিত হচ্ছে যেগুলোর ধরন এবং টার্গেট এবং প্রকাশ্যে তাদের ঘোষণা দেখে এর পিছনের ইসলামি উৎস ও সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। এবং এটাও পরিষ্কার হয় যে, খুনি বা হামলাকারীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু মুক্তচিন্তার লেখক, ব্লগার ও প্রকাশক এবং অতঃপর মূল ইসলামী ধারা বিচ্যুত মুসলমান এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা। দুঃখজনক হলেও সত্য, ইসলামি মৌলবাদী জঙ্গি গোষ্ঠী এইসব হত্যা, আক্রমণ ও হামলার পিছনে যুক্ত থাকলেও এযাবৎ সংঘটিত কোনও হত্যাকাণ্ডের বিচার এ দেশে হয় নি।

গত বছর (২০১৫) ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে ইসলামি মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠীর সবচেয়ে উর্বর সময়। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালে নৃশংস হত্যার শিকার হন ‘মুক্তমনা’ ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা, বিজ্ঞান লেখক, ব্লগার ও গবেষক ড. অভিজিৎ রায়। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত একুশে বইমেলায় তাঁর লেখা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করতে অভিজিৎ রায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন। বইমেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে প্রকাশ্য জনসাধারণের সামনেই হত্যাকারীরা ধারালো চাপাতি দিয়ে তাঁর মাথা ও ঘাড়ে উপর্যুপরি আঘাত করে তাঁকে হত্যা করে পালিয়ে যায়। পুরো ঘটনাটাই ঘটেছিল শত শত মানুষের উপস্থিতিতে, এবং ঘটনাস্থলের অনতিদূরে পুলিশ অবস্থান করলেও অভিজিতের প্রাণ রক্ষার্থে তারা কোন সহায়তা করেন নি। এই ঘটনার সময় তাঁর সাথে বিশিষ্ট বিজ্ঞান লেখক, মুক্তমনা ব্লগার, অভিজিতের স্ত্রী, রাফেদা আহমেদ বন্যাও মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হন। বন্যা আহমেদকে সাধারণ লোকজন হসপিটালে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা করাতে উনি প্রাণে বেঁচে যান।

এরপর ধারাবাহিকভাবে এইসব ইসলামি জঙ্গিদের হাতে ২০১৫ সালের মার্চ মাসের ৩১ তারিখ অনলাইন একটিভিস্ট ও ব্লগার ওয়শিকুর রহমান বাবু তার নিজের বাসার সামনেই প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হন। এরপর অফিসে যাবার পথে সকাল বেলা নিজ বাসার সামনেই বিজ্ঞান লেখক, ব্লগার অনন্ত বিজয় দাসকে কুপিয়ে খুন করে মে মাসের ১২ তারিখে। এবং ৭ আগস্ট নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় ওরফে নীলয় নীল ওরফে এনসি নীল নিজ বাসভবনে খুন হন। গত বছরের সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ছিল মুক্তচিন্তার লেখককের বই প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যা। ৩১ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে তাঁকে তাঁর প্রকাশনা সংস্থার অফিসেই জবাই করে খুন করে যায় ইসলামি জঙ্গিরা। একইদিন মুক্তচিন্তার লেখকদের বই প্রকাশক, লেখক ও কবি আহমেদুর রশিদ টুটুল, লেখক ও ব্লগার রণদীপম বসু এবং কবি তারেক রহিমের ওপরও ইসলামি জঙ্গিরা হত্যা করার উদ্দেশে চাপাতি ও আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা করে। এঁরা ৩ জনকে দ্রুত হসপিটালে নিলে সৌভাগ্যক্রমে তাঁরা প্রাণে বেঁচে যান। একইদিন এঁরা ৩ জন প্রাণে বেঁচে গেলেও জাগৃতি প্রকাশনীর ফয়সল আরেফিন দীপন প্রাণে বাঁচতে পারেন নি।

একটা বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, ধারাবাহিকভাবে লেখক, ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্টদের ওপর এই আক্রমণের সূচনা হয়েছে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্লগার আহমেদ রাজিব হায়দারকে হত্যার মধ্য দিয়ে। যিনি অনলাইন প্লাটফর্মে ‘থাবা বাবা’ নামে লেখালেখি করতেন। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি এবং ফাঁসীর দাবীতে শাহবাগ চত্বরে ঐতিহাসিক জনবিস্ফোরণের পরেই এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটা শুরু হয়েছে। এই যুদ্ধাপরাধীদের প্রায় সকলেই ইসলামি মৌলবাদী রাজনীতি ও সাধারণ মানুষ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত। এই যুদ্ধাপরাধীরা ছিল প্রধানত জামায়াতে ইসলামি নামক সংগঠনের নেতা-কর্মী। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের জাতিদ্রোহী ও দেশদ্রোহী ভূমিকা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের কঠোর শাস্তির দাবীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ শাহবাগে জমায়েত হন। এবং এই জমায়েত ও বিক্ষোভের পিছনে প্রকাশ্যে না এলেও পিছন থেকে ভূমিকা রেখেছিলেন মুক্তচিন্তার লেখক ও ব্লগারদের বড় একটি অংশ। বস্তুত এই আন্দোলনের শুরুটা হয়েছিল ব্লগ ও ফেসবুকে অনলাইন একটিভিস্টদের নিজেদের মধ্যে ইনবক্স ও পাবলিক পোস্টে যোগাযোগের মাধ্যমে। বাংলাদেশের আন্দোলনে যা সম্পূর্ণ নূতন ধারার সংযোজন ঘটায়। কারণ ব্লগ ও ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ সাইটের মাধ্যমে এই আন্দোলনের সূচনা ঘটে। যা এই দেশে অতীতে কখনও ঘটে নি। এই আন্দোলনের শুরুটা হয় তখনই যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গুরুতর যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে আদালত মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। যা ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্টরা প্রত্যাখ্যান করে সে রায়কে ‘প্রহসনমূলক রায়’ হিসেবে অভিহিত করে সরকারের সাথে যুদ্ধাপরাধীদের আপসের অভিযোগ করে। পরবর্তীতে শাহবাগ আন্দোলনের চাপে কাদের মোল্লার রায় রিভিউ করে অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

ব্লগার ও অনলাইন একটিভিস্টদের শাহবাগ আন্দোলনের সময় জামায়াতে ইসলামী এবং হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি সভাপতি খালেদা জিয়াও ব্লগারদের আন্দোলনকে ‘নাস্তিকদের আন্দোলন’ হিসাবে আখ্যায়িত করে তার বিরোধিতা করেন, জাতীয় সংসদে নাস্তিক ব্লগারদের কঠোর শাস্তি দাবি করেন। এভাবে ব্লগাররা রাজনৈতিকভাবে সমগ্র দেশের প্রশাসন ও জনগণের নিকট ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেলেন। উল্লেখ্য নেতিবাচক প্রচার-প্রপাগাণ্ডার কারণে ইসলামি দল ও সাধারণ ধর্মপ্রাণ লোকদের নিকট ‘নাস্তিক’ শব্দটি খুবই ঘৃণিত ও অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হয়। তাছাড়াও ইসলামি গোষ্ঠী সবসময়ই নাস্তিকদের ব্লাসফেমি আইনে ফাঁসি দাবি করে আসছে। এমনকী তারা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে বলেছে- ‘সরকার যদি নাস্তিকদের ফাঁসি না দেয় তাহলে তারা এইসব নাস্তিক ব্লগারদের জবাই করে খুন করবে’। এ লক্ষে ২০১৩ সালেই তারা ৮৪ জন নাস্তিক ব্লগারের একটি তালিকা সারাদেশে প্রকাশ করে। এই তালিকা ধরে একে একে সবাইকে খুন করা হবে বলেও এইসব ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠী বারবার প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে। খুন হওয়া ৫ জন ব্লগার-লেখকদের মধ্যে ৪ জনই ৮৪ তালিকাভুক্ত ব্লগার। গুরুতর আহতদের সংখ্যা বাদ দিলেও গত আড়াই বছরে বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিদের হাতে খুন হওয়া মুক্তচিন্তার ব্লগার-লেখকদের সংখ্যা এখনো পর্যন্ত ৭ জন।

এটা পরিষ্কার যে, যাঁরা নিহত হয়েছেন তাঁরা বেশিরভাগই ধর্মে অবিশ্বাসী কিংবা নাস্তিক হিসাবে পরিচিত ছিলেন। নিহতরা সকলেই নিজেদেরকে যুক্তিবাদী ও নিরীশ্বরবাদী হিসাবে দাবী করতেন এবং সকল প্রকার ধর্মীয় অন্ধ বিশ্বাস, গোঁড়ামি, মানবাতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাদের তীক্ষ্ণধার লেখালেখিই ছিল তাঁদের খুন হবার পিছনের কারণ। এ কারণেই জিহাদি তথা ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠী কাপুরুষোচিতভাবে এইসব গুপ্তহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশে অাভ্যন্তরীণ জিহাদি বা ইসলামি জঙ্গি রাজনীতির সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতিরও খুব শক্ত যোগসাজশ রয়েছে, যার আঁচ পাওয়া যায় ইসলামি দেশগুলোর কর্মকাণ্ডে। বিভিন্ন গবেষকও বিষয়গুলো নিয়ে তাদের দিকে বহুবার অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছেন। তা সত্বেও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সরকার, রাজনৈতিক দল ও নিরাপত্তা বাহিনীর কেউ-ই এটা দমন করার ব্যাপারে আন্তরিক নয়। জঙ্গিবাদ দমনের পরিবর্তে তারা সবাই মুক্তচিন্তার লেখক, ব্লগার ও প্রকাশকদের দমনে অধিক মনোযোগী। আর এ কারণে কেবলমাত্র বিরোধী দলই নয়, সরকারি দল তথা খোদ সরকারের মধ্যেও কোন কোনও অংশের সঙ্গে এই ধরনের হত্যা-হামলার যোগসূত্র থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিশেষত বিনা শাস্তিতে, বিনা বিচারে যেভাবে অপ্রতিরোধ্যভাবে খুন ও হামলাগুলি হয়ে চলেছে তাতে রাষ্ট্র এবং সরকারের ভিতরেও এগুলির পৃষ্ঠপোষকতা বা কৌশলী সমর্থন আছে, ব্লগাররা বার বার এমন অভিযোগ করে আসছেন। এইসব হত্যা ও হামলার ঘটনায় লক্ষণীয় ব্যাপার হল- সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ, যারা বিভিন্ন লেখালেখির মাধ্যমে জনমতকে প্রভাবিত করে, তাদেরকে হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা। বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগের বুদ্ধিজীবীদের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা ও মত-প্রকাশের স্বাধীনতার নামে ভণ্ডামির পরিবর্তে যারা এ দেশে প্রকৃত ধর্ম নিরপেক্ষতার চর্চাকে নূতন একটি মাত্রা দিয়েছিল, তাদেরকে বিনাশ করার মহাপরিকল্পনা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়।

বাংলাদেশের মতো মুসলিম অধ্যুষিত একটি দেশে যে দেশে শতকরা ৮৯% লোক মুসলিম, সে দেশে নিরীশ্বরবাদী এবং মুক্তচিন্তার মানুষরা নিতান্তই ক্ষুদ্র একটি অংশ। যে অংশের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বা রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণের কোন ক্ষমতাই নেই। তারপরও এই ক্ষুদ্র অংশটি কেন জিহাদিদের প্রধান টার্গেট হল সেটাই ভাবনার বিষয়। প্রকৃতপক্ষে অন্ধ ধর্মবিশ্বাস থেকে মুক্ত, যুক্তিবাদী এবং মুক্তচিন্তার মানুষরা লোকবাদী বা প্রকৃত সেক্যুলার বাংলাদেশের আদর্শিক ভিত্তি নির্মাণে একটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম। আর সে কারণেই আন্তর্জাতিক ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলো মুক্তমনা ব্লগার, লেখকদের খুনের পিছনে ছায়া হিসেবে ভূমিকা রাখছে। সেই ছায়ার ভিতরে অনেক বড় বড় শক্তির অস্তিত্বও বিদ্যমান।