ধর্মীয় মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ এক ভয়াবহ বিপদ হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। তবে আমি মনে করি, একে মোকাবিলা করা ও পরাস্ত করা কঠিন কিছু নয়। কারণ, বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধর্মীয় মৌলবাদের অনুকূলে নয়। ধর্মীয় মৌলবাদের, বিশেষ করে ইসলামি মৌলবাদের একটা আন্তর্জাতিক চরিত্র আছে। ইসলামি মৌলবাদের উৎস হচ্ছে আরব জগৎ ও মধ্যপ্রাচ্য।
মুক্তচিন্তা, ধর্মীয় সমালোচনা ও স্বাধীন মত প্রকাশ সম্পর্কে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির অসংখ্য সুস্পষ্ট প্রমাণ উল্লেখ করা যায়। পুলিসের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা মুক্তচিন্তার লেখকদের কঠোরভাষায় হুমকি দিয়ে সাবধান করে বলেন- “আমরা যেন সীমা লঙ্ঘন না করি। এমন কিছু লেখা উচিত নয়, যেখানে কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে, বিশ্বাসে আঘাত আনে।” এ বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন- ” কোনও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে কেউ বক্তব্য দিলে তা সহ্য করা হবে না।”
মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায় অনলাইন মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে ‘মুক্তমনা ব্লগ’ এর মাধ্যমে সমগ্র বাঙালি কমিউনিটিতে ধর্ম নিরপেক্ষতা, বিজ্ঞান চর্চা, সমাজবিজ্ঞানের চর্চার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, অনলাইনে বাঙালিদের মুক্তচিন্তার রেনেসাঁর সূচনা অভিজিৎ-এর মুক্তমনার হাত ধরেই। মুক্তবুদ্ধিচর্চার ক্ষেত্রে ‘মুক্তমনা’ ব্লগ একটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এই ধারার অসংখ্য মানুষ এখন ব্লগ কিংবা ফেসবুককে অবলম্বন করে লেখালেখির মাধ্যমে মুক্তচিন্তা চর্চা করে যাচ্ছেন যা তরুণ প্রজন্মের ভিতর ব্যাপক যোগাযোগ ও প্রভাব বিস্তার করেছে। এই প্রভাবের কেন্দ্রস্থল হল ‘মুক্তমনা’ ব্লগ। স্বাভাবিকভাবেই সবার জানা যে, এই ব্লগের প্রাণপুরুষ ছিলেন অভিজিৎ রায়। আর মুক্তচিন্তার এই যাত্রাকে পথরোধ করা বা আটকে দেয়ার জন্য ইসলামি মৌলবাদী গোষ্ঠী, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, ক্ষমতার বাইরে থাকা বিরোধী দল থেকে শুরু করে সমাজের স্বার্থান্বেষী সকল মহলই কম-বেশি জড়িত। এটা পরিষ্কার যে, ইসলামি জঙ্গিদের প্রধান টার্গেট ছিল অভিজিৎ রায় এবং সেই সাথে তাঁকে ও ‘মুক্তমনা’ ব্লগ কেন্দ্রিক গড়ে উঠা একদল প্রতিশ্রুতিশীল ও সম্ভাবনাময় লেখক। এখন দেখা যাচ্ছে, শুধু লেখক-ব্লগার কিংবা তাঁর ঘনিষ্ঠজনই নয়, তারা এখন অভিজিৎ-এর প্রকাশকদেরও হত্যার টার্গেট করেছে। অর্থাৎ এই গোষ্ঠীর কাছে অভিজিৎ-ই প্রধান টার্গেট ছিল। অভিজিৎ-এর কোনও ভিত্তি বা নাম-নিশানা তারা বাংলাদেশে রাখতে চায় না। অভিজিৎ যে লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে গিয়েছিলেন, সে লক্ষ্যকে তারা পুরোপুরি ধ্বংস করতে চায় বলেই এখনো হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশে বহু আগে থেকেই নাস্তিকতা চর্চা ছিল, কিন্তু তখন এই অপরাধে নাস্তিকদের খুন করার ট্রেন্ড ছিল না। এই ট্রেন্ড চালু হয়েছে বিশ্বব্যাপী ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থানের পর থেকেই। ১৯৭৪ সালে দাউদ হায়দারকে কবিতার জন্যে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এরপর ১৯৯১-১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমি বই মেলায় লেখক তসলিমা নাসরিনের বই উঠিয়ে নেওয়া হয়, বাংলা একাডেমি বইমেলায় তাঁর প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল। এমনকী সেসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত্ও করা হয় এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার ‘অপরাধে’ তাঁর বিরুদ্ধে ব্লাসফেমি ও ফাঁসির দাবি তোলে ইসলামি রাজনৈতিক দলসমূহ। তাঁর ফাঁসির দাবিতে সমগ্র দেশে অসংখ্য মামলা রুজু হয়, সরকারও তাঁর বিচারেরও চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি গোপনে দেশত্যাগ করায় সরকারি মামলা-মোকদ্দমা, ঝামেলা থেকে রক্ষা পেয়ে প্রাণে বেঁচে যান। এরপর নাস্তিক ও মুরতাদ ঘোষণা দিয়ে সমগ্র দেশে ড. আহমদ শরীফের ফাঁসি দাবি করে আন্দোলন গড়ে তোলে ইসলামি রাজনৈতিক দল। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে ইসলামী জঙ্গি সংগঠন হরকাত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামি মুক্তমনা কবি শামসুর রাহমানকে হত্যার চেষ্টা চালালেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান। এর কয়েকবছর পরে ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বাংলা একাডেমি বই মেলায় অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদের ওপরে নৃশংসভাবে হামলা চালানো হয়। এই হামলা ও আক্রমণের ফলে অল্প কিছুদিন পরই তাঁর মৃত্যু হয়। বাংলাদেশের সরকার এখনো পর্যন্ত ড. আজাদ হত্যাকাণ্ডের যথাযথ তদন্ত ও বিচার করেন নি। এরপর থেকেই মূলত বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার লেখকদের ওপর হামলার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। যা রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন ও রাজনীতিকদের প্রচ্ছন্ন সহায়তা কিংবা নীরবতার কারণেই ক্রমশ বিশাল আকার ধারণ করেছে।
বস্তুত ইসলামি জঙ্গি বা জিহাদিদের পরিকল্পনায় ব্লগারদের ওপর সাম্প্রতিক হত্যা ও হামলা, একইসঙ্গে সরকার ও রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা এবং এমনকী এদের প্রতি প্রশ্রয়মূলক আচরণ, ব্লগার-লেখকদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার-নির্যাতনের হুমকি ও হয়রানিমূলক ভূমিকা সরকার ও রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের যে অবিশ্বাস, সন্দেহ ও অনাস্থার জন্ম দিয়েছে তার কারণে ইতোমধ্যেই অনেক মুক্তচিন্তার ব্লগার-লেখক বাংলাদেশ ত্যাগ করে বিভিন্ন দেশে চলে গেছেন। কেউ কেউ পার্শ্ববর্তী দেশে সাময়িকভাবে আশ্রয় নিয়েছেন; এবং এখনো অনেকে দেশ ছেড়ে চলে যাবার চেষ্টা করছেন। এখানে একটা বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এসকল ব্লগার-লেখকরা নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে চাকুরী বা উন্নত জীবন কিংবা স্রেফ জীবিকার সন্ধানে পাশ্চাত্যে যাবার সিদ্ধান্ত নেন নি। তাঁরা মূলত নিজেদের নীতি-আদর্শকে রক্ষা করে জীবন বাঁচাবার জন্যই দেশত্যাগ করছেন। তাই তাঁদের দেশ ছেড়ে এভাবে চলে যাওয়াটা অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
যাই হোক, সংক্ষেপে এই আলোচনায় এটুকু অন্তত বোঝা যায় যে, যারা ধর্ম এবং বিশেষত ইসলাম ধর্মের সমালোচক; তারা এই খুনিদের প্রধান টার্গেট হয়েছে। এবং এই ধরনের খুনের পিছনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ধরনের রাজনীতির সংমিশ্রণও বিদ্যমান। আর এ কারণে মুক্তমনা লেখক-ব্লগারদের কাছে বাংলাদেশ এখন এক শ্বাপদের নাম
কিন্তু সেখানকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজ থেকে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজ একেবারে ভিন্ন। আমাদের আছে একটি সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, যার মধ্যে রয়েছে মানবতাবোধ ও ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গি। আরব দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য তেমন কখনোই ছিল না। আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের পাশাপাশি আরও ছিল বামপন্থী ও সাম্যবাদী রাজনৈতিক আন্দোলন, যা একসময় যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। এই সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিও আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির মধ্যে ভালোভাবেই দেখা যাবে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস ও সংস্কৃতির মধ্যে দেখা যাবে না।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি মৌলবাদের ক্ষেত্রে অন্য একটি জিনিস দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো ধর্মীয় সংগঠন মৌলবাদের চর্চা করলেও পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদবিরোধী উপাদানও তার মধ্যে দেখা যায় এবং সেই কারণে তারা জনপ্রিয়ও বটে। যেমন লেবাননে হিজবুল্লাহ অথবা গাজায় হামাস। তারা সশস্ত্রও বটে। ১৯৯৯ সালে ইউএনডিপি এক রিপোর্টে উল্লেখ করেছিল:
‘বিশ্বজোড়া ভোগবাদী সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক সমসত্ত্বতা গড়ে তোলার জেরে মৌলবাদী তৎপরতা বেড়েছে। স্থানীয় আঞ্চলিক সংস্কৃতিচর্চায় ফের উৎসাহ দেখা দিচ্ছে। রাজনৈতিক আন্দোলনে স্থানীয় সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় রক্ষার প্রশ্নটি গুরুত্ব পাচ্ছে। মৌলবাদী আন্দোলনগুলোর বিকাশের মধ্যে তা প্রতিফলিত হয়।’
মধ্যপ্রাচ্যে পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্বজাতীয় সংস্কৃতি ধরে রাখার ও আত্মপরিচয় তুলে ধরার প্রবণতার মধ্যে জাতীয়তাবাদী উপাদান আছে, যার সঙ্গে ইসলামকে এক করে দেখার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে কোনো মৌলবাদী সংগঠন, তা জামায়াত, হেফাজত, জেএমবি—যে-ই হোক, কারও কথায় বা কাজে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী উপাদান নেই। জাতীয়তাবাদী উপাদানও নেই। বরং এই ধরনের সব ধর্মীয় রাজনৈতিক দল ও সংগঠন বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি সংস্কৃতিকেই অস্বীকার করতে চায়। ঠিক এই কারণেই ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠনগুলো এই দেশে কোনো গণভিত্তি অর্জন করতে আগেও পারেনি, এখনো পারবে না।