একটি দিনের গল্প: ফুলতলীর একজন মানুষের জীবন ( কাল্পনিক তবে বাস্তব)
সকালবেলা রাশেদ ঘুম থেকে ওঠে আজান শুনে।
সবকিছু স্বাভাবিক। ঘর, উঠান, আকাশ—সব আগের মতোই।
কিন্তু রাশেদ জানে, এই স্বাভাবিকতার ভেতরেই সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি লুকিয়ে থাকে।
সে কথা কম বলে। অভ্যাস হয়ে গেছে।
একসময় সে প্রশ্ন করত—কেন মেয়েরা স্কুলে যেতে পারে না,
কেন কারও মত আলাদা হলেই সমস্যা,
কেন ভয় পেয়ে চুপ থাকতে হয়।
এখন আর করে না।
নাশতার সময় রাশেদের স্ত্রী চুপচাপ বসে থাকে।
সে একসময় পড়াশোনা করতে চাইত।
এখন সে শুধু জানে—কোথায় কথা বলা যাবে, কোথায় নয়।
এই জানাটাকেই সবাই এখানে “বুদ্ধি” বলে।
রাশেদের মেয়ে স্কুলে যায় না।
কারণ “পরিস্থিতি ভালো না”।
এই বাক্যটা এখানে খুব পরিচিত।
এটা দিয়ে সবকিছু ঢেকে দেওয়া যায়—ভয়, বাধা, অন্যায়।
বাজারে গেলে রাশেদ সাবধানে কথা বলে।
ভুল মানুষ শুনে ফেললে সমস্যা হতে পারে।
কে কার লোক—এই হিসাবটা এখানে দামের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
দুপুরে সে মোবাইলে একটা খবর পড়ে।
কোথাও মানুষ নিজের অধিকারের কথা বলেছে।
রাশেদ স্ক্রল করে চলে যায়।
কারণ এখানে বেশি পড়াও নিরাপদ নয়।
বিকেলে পাড়ার চায়ের দোকানে সবাই রাজনীতি, ধর্ম, সমাজ নিয়ে কথা বলে।
কিন্তু খুব হিসেব করে।
সব কথার শেষে একটা লাইন থাকেই—
“ভাই, বেশি কথা ভালো না।”
এই লাইনটাই ফুলতলীর অঘোষিত সংবিধান।
রাতে ঘুমানোর আগে রাশেদ ভাবে—
সে কি কাপুরুষ?
নাকি সে শুধু বাঁচতে চায়?
এই প্রশ্নের উত্তর সে আর খোঁজে না।
কারণ উত্তর খুঁজতে গেলে প্রশ্ন করতে হয়।
আর প্রশ্ন এখানে বিপজ্জনক।
ফুলতলীতে কাউকে জেলে যেতে হয় না মানবাধিকার চাওয়ার জন্য।
ভয়টাই যথেষ্ট।
ভয়ই শাসন করে।
ভয়ই আইন।
এখানে মানবাধিকার নেই—এমন নয়।
এখানে মানবাধিকার আছে, কিন্তু তালাবদ্ধ।
আর চাবিটা কার হাতে—তা সবাই জানে, কেউ বলে না।
রাশেদ ঘুমিয়ে পড়ে।
আর ফুলতলী আরেকটা দিন পার করে—
মানুষ বেঁচে থাকে,
কিন্তু অধিকারটা আবারও আগামীকালের জন্য তুলে রাখা হয়।