ফুলতলীতে জঙ্গী গোষ্ঠীর নিপীড়ন: বোরকা না পরায় মেয়েদের উপর নির্যাতন, প্রাণনাশের হুমকি ফারজানা ইসলাম তাহমিনাকে
সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটের মোঘলাবাজারে এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে, যেখানে তথাকথিত “ধর্মরক্ষার” নামে এক ফুলতলী নামক জঙ্গী গোষ্ঠী স্থানীয় মেয়েদের বোরকা পরতে বাধ্য করছে। এই গোষ্ঠী নিজেদেরকে ইসলামের রক্ষক দাবি করলেও, তাদের কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হচ্ছে চরমপন্থা, নারীবিদ্বেষ এবং সহিংসতার নগ্ন রূপ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গোষ্ঠীর সদস্যরা এলাকাজুড়ে নারীদের ওপর ভয়ভীতি সৃষ্টি করছে। মেয়েরা যদি তাদের নির্দেশ অনুযায়ী বোরকা না পরে বা আধুনিক পোশাক পরে বাইরে যায়, তাহলে তাদের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে। অনেক নারী এখন আতঙ্কে ঘর থেকে বেরোতে পারছেন না।
এই জঙ্গী চক্রের টার্গেটে পড়েছেন আমার স্ত্রী তরুণ শিক্ষার্থী ফারজানা ইসলাম তাহমিনা। তিনি একজন শিক্ষিত, সচেতন এবং মুক্তচিন্তার মানুষ। বোরকা পরাকে তিনি ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় বলে মনে করেন, বাধ্যবাধকতা নয়।
।
এই মত প্রকাশ করায় ফুলতলীর জঙ্গী গোষ্ঠী তার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয় এবং প্রকাশ্যে তাকে হত্যার হুমকি দেয়। স্থানীয় বাজারে ও সামাজিক মাধ্যমে তাহমিনাকে অপমান করা হয়, এমনকি তার বাড়িতে হুমকির চিঠিও পৌঁছায়।
এ ঘটনায় মোঘলাবাজার মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাবাসী বলছে, “আমরা ধর্ম মানি, কিন্তু এইভাবে ভয় দেখিয়ে কারো ওপর পোশাক চাপিয়ে দেওয়া ইসলাম নয়। এটা বর্বরতা।”
আমার স্ত্রী এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আমরা প্রশাসনের কাছে সুরক্ষার আবেদন জানিয়েছে, কিন্তু এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এটি শুধুমাত্র পোশাকের বিষয় নয় — এটি নারীর স্বাধীনতা, শিক্ষা, এবং আত্মসম্মানের ওপর সরাসরি আঘাত।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও পোশাক নির্বাচনের অধিকার দিয়েছে। কিন্তু ফুলতলীর এই ঘটনাটি প্রমাণ করছে, কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী এখনো সেই অধিকারকে দমিয়ে রাখতে চায়।
গ্রামের মানুষের দাবি — এই জঙ্গী চক্রকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ “ধর্মের নামে” এমন বর্বরতা করার সাহস না পায়।
ধর্মের নামে ভয় দেখানো ও নিপীড়নের রাজনীতি
স্কুল ও মহল্লাগুলোতে এই গোষ্ঠীর সদস্যরা প্রতিদিন টহল দেয়ার মতো আচরণ করছে। তারা রাস্তায় হাঁটা মেয়েদের পোশাক নিয়ে মন্তব্য করছে, স্কুলে পড়ুয়া ছাত্রীদের উদ্দেশে “ধর্ম রক্ষা”র নামে অপমানজনক কথা বলছে। অনেকে বলছেন, এসব উগ্রপন্থীরা স্থানীয় মসজিদ ও মাদরাসার ছায়ায় সংগঠিত হচ্ছে এবং অল্প শিক্ষিত তরুণদের ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যা শিখিয়ে নিজেদের দলে টানছে।
কিছুদিন আগে বাজারে এক শিক্ষার্থীকে “দুপুরবেলা বোরকা ছাড়া হাঁটতে দেখা গেছে” এই অভিযোগে জনসম্মুখে অপমান করা হয়। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকেও ‘কাফের’ বলে গালাগাল দেওয়া হয়। এমনকি স্থানীয় কয়েকটি দোকানদারকে জোর করে বলা হয়েছে যেন তারা “বোরকা ছাড়া কোনো মেয়েকে পণ্য বিক্রি না করে।”
ফারজানা ইসলাম তাহমিনার বিরুদ্ধে জীবননাশের হুমকি
এই উগ্র গোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় টার্গেট হয়েছেন তরুণ শিক্ষার্থী ফারজানা ইসলাম তাহমিনা।
তাহমিনা একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণী — তিনি নারীর অধিকার ও মুক্তচিন্তার পক্ষে কথা বলেন। তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন,
> “বোরকা পরা বা না পরা ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। কেউ জোর করে কারো শরীর বা পোশাক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ধর্মের নামে ভয় দেখানো মানবতার বিরুদ্ধে।”
তার এই কথার পর থেকেই জঙ্গী গোষ্ঠী তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তাদের সদস্যরা তাহমিনার ছবি বিকৃত করে প্রচার শুরু করে, তাকে “অবিশ্বাসী নারী” ও “ইসলামের শত্রু” আখ্যা দেয়। এরপর তারা প্রকাশ্যে তাকে হত্যার হুমকি দেয়, এমনকি এক রাতে তাহমিনার পরিবারের বাড়ির দরজায় হুমকির চিঠি ফেলে যায় — যেখানে লেখা ছিল,
> “তুমি যদি ইসলাম বিরোধী কথা বলা বন্ধ না করো, তবে তোমার জায়গা হবে কবর।”
এই ঘটনার পর তাহমিনা ও তার পরিবার গভীর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও এখনো কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি প্রশাসন। বরং কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বলছেন “মেয়েটাই নাকি বাড়াবাড়ি করেছে” — যা আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছে।
সমাজে আতঙ্ক, মেয়েরা ঘরবন্দি
অসংখ্য পরিবার এখন ভয় ও অনিশ্চয়তায় ভুগছে। অনেক বাবা-মা তাদের মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে এই উগ্র গোষ্ঠীর সদস্যরা অবস্থান নেয়, মেয়েদের পোশাক নিয়ে মন্তব্য করে এবং ভিডিও ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়।
একজন স্থানীয় অভিভাবক বলেন,
> “আমাদের মেয়েরা স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছে। ওরা বোরকা না পরলে ছবি তুলে হুমকি দেয়। এটা কী ইসলাম? এটা তো বর্বরতা।”
আইনের শাসনের অনুপস্থিতি ও প্রশাসনের নীরবতা
এলাকার সচেতন নাগরিকরা বলছেন, প্রশাসনের নীরবতাই এই উগ্র গোষ্ঠীকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এটি শুধু একটি স্থানীয় সমস্যা নয় — বরং বাংলাদেশের সংবিধান ও নারী অধিকার বিরোধী এক বিপজ্জনক উদাহরণ।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ ও ৩৭ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিককে জীবন, স্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের অধিকার দিয়েছে। কিন্তু ফুলতলীতে সেই অধিকার আজ বন্দী। ধর্মের নামে নারীদের পোশাক, চলাফেরা এবং চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর সরাসরি আঘাত।
মানবাধিকার কর্মী ও মুক্তচিন্তকদের প্রতিক্রিয়া
দেশের বিশিষ্ট লেখক ও মানবাধিকার কর্মীরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলছেন,
> “বোরকা পরা বা না পরা কোনো বিশ্বাসের পরিমাপক নয়। বিশ্বাস জোর করে চাপিয়ে দিলে তা ধর্ম নয়, দমননীতি।”
তারা সরকারের কাছে দাবি করেছেন, অবিলম্বে ফুলতলীর জঙ্গী গোষ্ঠীকে আইনের আওতায় আনা হোক, এবং ফারজানা ইসলাম তাহমিনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।
শেষ কথা: ফুলতলীর অন্ধকারে এক আলোর নাম তাহমিনা
ফারজানা ইসলাম তাহমিনা এখন ভয় ও সাহসের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন। তার একার প্রতিবাদই প্রমাণ করছে — এখনো এই দেশে এমন মানুষ আছে যারা ভয় পায় না, যারা জানে স্বাধীনতার মানে কী।
ফুলতলীর এই ঘটনার পর দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে। সামাজিক মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ #JusticeForTahmina হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
মানুষের প্রশ্ন একটাই —
বাংলাদেশ কি আবার সেই উগ্র অন্ধকারে ফিরে যাচ্ছে, যেখানে নারীর পোশাক, চিন্তা ও স্বাধীনতা গুলির মুখে বন্দি হয়ে যাবে?
এখন সময় — রাষ্ট্র ও সমাজকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে, যেন আর কোনো তাহমিনাকে “ধর্মের নামে” হুমকি, অপমান বা মৃত্যু ভয় সহ্য করতে না হয়।