২০১০ সালে বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করলেও রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে থেকে গেছে ‘ইসলাম’। কারণ, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ চায়নি রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ‘ইসলাম’কে সংবিধান থেকে বাদ দিয়ে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিতে। এর ফলে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলামের মধ্যে একটা সাংঘর্ষিক অবস্থা রয়েই গেছে। তবে পরিপ্রেক্ষিত যা-ই হোক না কেন, আমাদের উপলব্ধি করা আবশ্যক কেন আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ-বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে নানা চড়াই-উতরাইয়ের সম্মুখীন হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে।
সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে এদেশে মৌলবাদ ও ইসলামিকরণের যে উত্থান ঘটেছিল তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তারা বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় ইসলামি মূল্যবোধ ও আদর্শের নানাবিধ প্রয়োগ সম্পর্কে জনগণকে উৎসাহী করার পাশাপাশি তাদের ইসলামি আচার-আচরণ ও ধ্যান-ধারণা চর্চায় অনুপ্রাণিত করেছে। সে সময় যুক্তি নয়, মানুষকে পারলৌকিক সুখ-শান্তির কথা বলে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা লক্ষণীয়।
এদিকে কট্টরপন্থী কিছু ওলামাদের উত্থান ও মাদ্রাসা শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার রাজনীতিকে ইসলামিকরণে উৎসাহ জোগাতে থাকে। তার ফলে ইসলামি-পরিচিতির দিকে ঝুঁকে পড়ে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এবং জাতিগত ও অন্যান্য ধর্মবিশ্বাসীদের সঙ্গে ইসলাম বিশ্বাসীদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। উনিশ শতকে ঠিক এভাবেই বাঙালি মুসলমান ইসলামি ভাবধারার পুনরুজ্জীবনকেন্দ্রিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিল।
ধর্মীয় গোঁড়ামির ফলে কিছু মানুষ ‘বিশ্বাসে’র মূল অনুষঙ্গগুলো থেকে বহুদূরে সরে গিয়ে নিমজ্জিত হয়েছে অথৈ অন্ধকারে। এতে বাধাগ্রস্ত হয়েছে জনসাধারণের, বিশেষ করে কোমলমতি শিশুদের, ব্যক্তিত্বের বিকাশ। কার্যত এসব পাঠ্যসূচি প্রণীত হওয়া উচিত ইসলামি মূল্যবোধ ও মৌলিক মতবাদের ভিত্তিতে। এ প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ মাসুদা বানু বলেছেন, ইসলামি যুক্তিবাদ মূলত সুন্নি মুসলমানদের বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর বিস্তার মুসলমানদের প্রাচীন ধর্মীয় কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে ইসলামের মূল্যবোধ ও সত্য-অন্বেষণে আগ্রহী করে তোলে। একইসঙ্গে সামাজিক অনেক সমস্যা সমাধানেরও পথ দেখায়। মাদ্রাসা শিক্ষা, ধর্মীয় সভা-সমাবেশে নানা বক্তব্য-বিবৃতি ও গণমাধ্যমের কার্যকর ভূমিকা জনসাধারণের মধ্যে ইসলামি যুক্তিবাদের ব্যাপক প্রচার-প্রসার ঘটিয়ে ধর্ম সম্পর্কিত কাল্পনিক ও অযৌক্তিক চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে সন্দেহাতীতভাবে। এ ধরনের পদক্ষেপ সামাজিক-সচেতনতাকে উৎসাহিত করবে। শুধু তা-ই নয়, জনসাধারণকে ইসলামের মূলনীতিগুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেওয়া গেলে ব্যক্তিত্বের উন্মেষের পাশাপাশি সমাজের উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে।
ইসলামি সংস্কারক ও চিন্তাবিদ সৈয়দ আহমেদ খানের দৃষ্টিতে, উনিশ শতকে বাঙালি মুসলমানের পশ্চাৎমুখী যাত্রার অন্যতম কারণ ছিল ধর্মীয় গোঁড়ামি। আমরা যদি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এর সামাজিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করি, তবে দেখতে পাবো, ‘অনৈসলামিক’ আখ্যা দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ থেকে মানুষকে সরিয়ে আনা হয়েছে, এবং এখনও হচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, ব্যক্তি ও সমাজ-জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের যে ইতিবাচক বিস্তৃতি ঘটেছিল তাকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। আরবীয় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী আলিয়াব্দ আল-রাজিকের ভাষ্য অনুসারে, ‘মানুষ-আবিষ্কৃত নতুন নতুন মতবাদ ও বিভিন্ন দেশের নানামুখী অভিজ্ঞতার আলোকে নব্য রাজনৈতিক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠায় কখনোই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি ইসলাম ধর্মে।’ ফলে এটা সহজেই অনুমেয়, ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলামের মূলনীতিগুলো বরাবরই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ধর্মনিরপেক্ষতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে যুক্তিবাদ ও যুক্তি। এর অর্থ হলো, ইসলামি যুক্তিবাদের আলোকে সাধারণ মানুষের এই ভুল ধারণা ভেঙে দেওয়া যে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয় এবং ধর্ম ও রাজনীতির বিভক্তি রাজনৈতিক-সামাজিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে থাকে।
পরিশেষে এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশে ইসলামিকরণের উত্থান এবং ধর্মনিরপেক্ষকরণে সৃষ্ট বাধার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় ক্রিয়াশীল। সামরিক শাসকরা তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিলের জন্য ইসলামকে ব্যবহার করেছে, যেমনটা করেছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা। এর মধ্য দিয়ে ‘উপনিবেশ-উত্তর তত্ত্ব’ পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।
নিজের স্বার্থের জন্য অনেক প্রতিষ্ঠানও ইসলাম ধর্মের প্রতি সাধারণ মানুষের আনুগত্যকে কাজে লাগিয়েছে। অতি বিশ্বাস এবং ইসলাম সম্পর্কে ভাসা ভাসা জ্ঞানের কারণে মানুষ অজ্ঞানতাকে আঁকড়ে ধরেছে। এতে বাধাগ্রস্ত হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের ধারণা।
তবে মাদ্রাসা শিক্ষা, ওলামাগণের সঠিক বক্তব্য-ব্যাখ্যা এবং গণমাধ্যমের ইসলাম সম্পর্কিত সঠিক প্রচার-প্রচারণাই পারে ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ গড়ার পথে বড় ভূমিকা রাখতে। ইসলাম ধর্মের মূলনীতির আলোকে যথাযথ শিক্ষা মানুষকে মৌলিক ন্যায়বিচার বিষয়ে জ্ঞান ও বিশ্বাস অর্জনে সর্বতো সাহায্য করতে পারে। এই শিক্ষা মানুষকে মৌলবাদিতা ও জ্ঞানশূন্য অন্ধকার জগৎ থেকে আলোর দিকে ধাবিত করবে। একই সঙ্গে তারা বুঝতে সমর্থ হবে যে মানবতার কল্যাণের জন্যই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পৃথকীকরণ অত্যন্ত জরুরি।